আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ছবি : সংগৃহীত
মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরার ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদক দমনের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন থাকলেও প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইতিবাচক কর্মসূচির প্রচারও অনেকটা ম্লান হয়েছে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘণ্টি ঘর রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ইশরাকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করতে দেখা যায়। তাঁর পাশের একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
ঘটনাটি নিয়ে দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে একজন প্রতিমন্ত্রী কেন নিজেই অস্ত্র হাতে অভিযানে নামলেন? তাঁদের মতে, এ ধরনের আচরণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে বিতর্কের ছায়া
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা ও ফুটপাতসহ ১৩টি স্থান পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেবার মান ও পরিচ্ছন্নতা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময়সীমা বেঁধে দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিদর্শনে থাকা মন্ত্রিসভার এক সদস্যের মতে, দিনভর কর্মসূচির ইতিবাচক আলোচনা ইশরাকের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও মাদকবিরোধী উদ্যোগের উদ্দেশ্য সমর্থন করলেও প্রতিমন্ত্রীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিএনপির একাধিক নেতার অভিমত, একজন প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত সরকার ও মন্ত্রিসভার ওপর পড়ে। তাঁদের মতে, মাদক দমনে প্রশাসনকে সহযোগিতা করাই জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব; অস্ত্র হাতে নিজে অভিযানে নামা নয়।

আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ছবি : সংগৃহীত
আত্মরক্ষার দাবি, তদন্তে পুলিশ
বিতর্কের মুখে রোববার (১৮ অক্টোবর) বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, একটি মাদক আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। তাঁর দাবি, আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
তবে অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে তাঁদের বিষয়টি জানাননি। ইশরাকও এর আগে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর পুলিশকে আসতে বলেন।
অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অস্ত্রের বৈধতার পাশাপাশি আচরণ নিয়েও প্রশ্ন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালায় অন্যের মধ্যে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইশরাকের অস্ত্রটি বৈধ হলেও সেটি যেভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে, তা আইনের ব্যত্যয় কি না, তদন্তে তা খতিয়ে দেখা হবে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার পাশাপাশি ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও উঠেছে। তিনি অবশ্য ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নিজের দলের কেউ মাদক কারবারে জড়িত থাকলেও ছাড় না দেওয়ার কথা বলেছেন।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাকের কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দল ও সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়া জরুরি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। এখন পুলিশের তদন্তের ফল এবং এ ঘটনায় সরকারের পরবর্তী অবস্থানের দিকে নজর সংশ্লিষ্টদের।