বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর হালনাগাদ করা প্রতিবেদনটিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য সংকলন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তিন কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। তাঁরা রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। মোট ১৫টি সূত্রের ২৪ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
এতে একদিকে রাজনৈতিক পরিবেশের উন্নতি, মতপ্রকাশের সুযোগ বৃদ্ধি এবং নির্বাচনের পর সহিংসতা কমে আসার কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রমাণের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও মামলা, দুর্নীতি, পুলিশি জবাবদিহির দুর্বলতা, বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার অভিযোগও উঠে এসেছে।
এই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর মামলা। তাঁর পরিবারের কাছে জামিনের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবির অভিযোগ নিয়ে এর আগে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের তদন্তেও ওই অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়।
তবে ব্রিটিশ প্রতিবেদনে ফজলে করিম চৌধুরীর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের অনুসন্ধানের উল্লেখ রয়েছে।

ব্রিটিশ প্রতিবেদন
ব্রিটিশ প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির যে চিত্র
প্রতিবেদনের নির্বাহী সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পার করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় এখন মতপ্রকাশ, সংগঠন পরিচালনা, জনসমক্ষে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বেড়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিরোধী গোষ্ঠী সভা-সমাবেশ, প্রচার-প্রচারণা, বিক্ষোভ এবং সরকারের সমালোচনা করতে পারছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনকে বিভিন্ন সূত্র তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ এবং আগের কয়েকটি নির্বাচনের চেয়ে কম সহিংস বলে বর্ণনা করেছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও কমেছে বলে তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি প্রতিবেদনটি। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, দরপত্র এবং স্থানীয় ক্ষমতা নিয়ে বিরোধের কারণে সংঘাত অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির প্রতি জনসাধারণের একাংশের বিরূপ মনোভাবের বিষয়টিও উঠে এসেছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে এ অবস্থার অন্যতম প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, তাঁদের বাড়িঘরে হামলা, আত্মগোপনে থাকা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির অভিযোগও এসেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবেশে কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও সুযোগ বৃদ্ধি পেলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মামলা, তালিকায় শত শত নাম
প্রতিবেদনে সংকলিত একটি সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কিছু মামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কোনো কোনো মামলায় শতাধিক ব্যক্তির নাম থাকলেও প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার নির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারদাতার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো মামলায় তালিকার ৯৯তম ব্যক্তি হওয়ার কারণেও কেউ আসামি হয়ে যেতে পারেন, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধে অংশ নেওয়ার প্রমাণ নাও থাকতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রতিশোধ নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
এ ধরনের অভিযোগের তাৎপর্য শুধু আসামির সংখ্যা নিয়ে নয়। ফৌজদারি বিচারের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি এবং অপরাধে তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা পৃথকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, কোনো এলাকায় বসবাস কিংবা একটি তালিকায় নাম থাকা নিজে থেকে অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।
সাক্ষাৎকারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু এলাকায় মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে। কোনো কোনো ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের মামলা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে, আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক মামলার রূপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হলে তা থেকে বোঝা যেতে পারে যে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ছিল। কিন্তু সব মামলা মিথ্যা ছিল, কিংবা সব আসামিই নির্দোষ ছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত প্রতিটি মামলার নথি ও বিচারিক মূল্যায়ন ছাড়া টানা সম্ভব নয়।
২১ হাজার ৫৮৫টি মামলা প্রত্যাহারের তথ্য দিল পুলিশ
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের তথ্যও রয়েছে। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দায়ের করা ২১ হাজার ৫৮৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব মামলাকে মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
পুলিশের কর্মকর্তারা আরও বলেন, মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াটি চলমান ছিল এবং জেলা পর্যায়ে এ বিষয়ে আবেদন ও সুপারিশ আসছিল।
প্রতিবেদনে বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি অথবা তাঁর পরিবারের সদস্য মামলা প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার কমিটির কাছে আবেদন করতে পারেন। দেশের ৬৪ জেলায় এ ধরনের কমিটি রয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আবেদন পাওয়ার পর জেলা পর্যায়ে অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় সরকারি কৌঁসুলির মাধ্যমে আবেদন যাচাই করা হয় এবং মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক বলে বিবেচিত হলে তা প্রত্যাহারের সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংখ্যাগুলো পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য। প্রত্যাহার করা প্রতিটি মামলার তালিকা, অভিযোগের ধরন, অভিযুক্তের সংখ্যা এবং আদালতের চূড়ান্ত আদেশ বিশ্লেষণ না করে এই পরিসংখ্যানের পূর্ণ তাৎপর্য নির্ধারণ করা কঠিন।
একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়, মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার প্রমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর বিচার কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে।
কারণ, একদিকে নিরপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া জরুরি, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধে জড়িত ব্যক্তির জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হয়। এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করাই ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য সেবা
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, প্রত্যেক নাগরিকের পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর এবং সহায়তা চাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা এবং কোনো কর্মকর্তা আইন অতিক্রম করলে তার ব্যক্তিগত দায় তৈরি হয়।
তবে একই সাক্ষাৎকারে পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ রয়েছে। তাঁরা আরও বলেন, বাংলাদেশের পুলিশ যুক্তরাজ্যের পুলিশের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না; প্রশাসনিক কাঠামো এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকার কারণে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তারের কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই বলেও একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তারের ভাষা মূলত সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে ব্যবহৃত হয়; পুলিশের কাছে এ ধরনের গ্রেপ্তারের আলাদা কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান নেই।
এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে। রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার, মামলা কিংবা হয়রানির অভিযোগ কতটা ব্যাপক, তা নির্ধারণ করতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য, মামলা-সংক্রান্ত নথি, আদালতের আদেশ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
পুলিশের কর্মকর্তারা আরও বলেন, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ সদস্যদের প্রাণহানি ও মানসিক আঘাত বাহিনীর ওপর প্রভাব ফেলেছে। জনবলসংকটও একটি বড় সমস্যা। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে গড়ে প্রায় ৮০০ মানুষের জন্য একজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
তবে পুলিশি কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অভিযোগের তদন্তে অবহেলা, রাজনৈতিক প্রভাব, বেআইনি গ্রেপ্তার কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে তার স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও প্রমাণের মান নিয়ে প্রশ্ন
বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দ্রুত তদন্ত ও বিচারের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পর তদন্ত ও বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগলে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও সামাজিক, পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কোনো ব্যক্তি নির্দোষ হলে দুই বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়ায় আটকে থাকা তাঁর জন্য বড় ধরনের হয়রানির কারণ হতে পারে। চাকরি, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য সুযোগ হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়।
সাক্ষী, বিচারক কিংবা সরকারি কৌঁসুলি নির্ধারিত দিনে আদালতে উপস্থিত না থাকলে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার কথাও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়।
তবে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার অর্থ প্রমাণ যাচাইয়ের মান কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেই দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
এই প্রশ্নটি ফজলে করিম চৌধুরীর মামলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর মামলায় সাক্ষ্যবিবরণীর ভাষায় মিল থাকার অভিযোগ এবং পরিবারের কাছে ঘুষ দাবির ঘটনা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রভাব মূল মামলার প্রতিটি অভিযোগের ওপর কীভাবে পড়বে, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণের পৃথক বিচারিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবির অভিযোগ
চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা এবং তাঁর পরিবারের কাছে অর্থ দাবির অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে।
২০২৬ সালের ১০ মার্চ প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিং, কললগ এবং সংশ্লিষ্ট কণ্ঠস্বর যাচাইয়ের কথা বলা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর অভিযুক্ত প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনাটি তদন্তের জন্য ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।
পরবর্তী সময়ে ২১ এপ্রিল প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটি সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা দাবির অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে। ফজলে করিম চৌধুরীর স্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিংও প্রকৃত বলে নিশ্চিত হওয়ার কথা তিনি জানান।
তবে তখন পর্যন্ত অর্থের প্রকৃত লেনদেন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ দাবির অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া এবং অর্থের লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি এক নয়। একইভাবে অভিযোগের তদন্তে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সব অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে, এমনও নয়।
তারপরও ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে জামিনের বিনিময়ে অর্থ দাবির অভিযোগ বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য গুরুতর বিষয়। অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করা বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদনটিতে প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের অনুসন্ধানের উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ব্রিটিশ প্রতিবেদনের ওই অংশকে ফজলে করিম চৌধুরীর মামলার বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
একই মামলায় ১৪টি সাক্ষ্যবিবরণীতে প্রায় একই ভাষা
ফজলে করিম চৌধুরীর মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এর আগে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
২০২৬ সালের ২৮ জুলাই প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত একটি মামলায় ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ৫৫টি সাক্ষ্যবিবরণী পর্যালোচনা করে উল্লেখযোগ্য পুনরাবৃত্তি পাওয়া গেছে। ওই ২২ আসামির একজন ফজলে করিম চৌধুরী।
সংস্থাটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, অভিযোগমূলক ছয় লাইনের একটি অংশ প্রায় হুবহু পাওয়া গেছে ১৪টি সাক্ষ্যবিবরণীতে। আরও একটি দীর্ঘ অভিযোগমূলক অংশ প্রায় একই ভাষায় রয়েছে নয়টি সাক্ষ্যে।
সাক্ষ্যবিবরণীতে এ ধরনের পুনরাবৃত্তি থাকলে তা তদন্তের পদ্ধতি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে একাধিক সাক্ষীর বক্তব্যে একই ধরনের শব্দচয়ন, বাক্যগঠন বা অভিযোগের বিবরণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্য কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ীদের বিচার হওয়া জরুরি। কিন্তু সেই বিচার অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করে সম্পন্ন করতে হবে।
সংস্থাটি ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছে। ফলে একই মামলায় সাক্ষ্যবিবরণীর পুনরাবৃত্তি এবং প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ একত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি ও কারাগারে ঘুষের অভিযোগ
যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদনে সংকলিত আরেকটি সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু ব্যক্তি কারাগারে সুযোগ-সুবিধা পেতে অর্থ দিতে বাধ্য হয়েছেন। সাক্ষাৎকারদাতার দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গ্রেপ্তার হওয়া বা কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের কেউ কেউ জামিন পেতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। কারাগারে নির্দিষ্ট বিভাগে থাকার সুযোগ পেতেও অর্থ দেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
ওই সাক্ষাৎকারে প্রতি ক্ষেত্রে প্রায় এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্কটি সাক্ষাৎকারদাতার বক্তব্য; প্রতিবেদন থেকে এটিকে দেশজুড়ে কারাগারে ঘুষের কোনো যাচাইকৃত গড় হার হিসেবে দেখানো যাবে না।
একই সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি কারাগার থেকে মুক্তি পেতে অর্থ দিয়েছেন। কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন এবং কেউ কারাগারে আছেন বলেও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। কারাগারের প্রশাসনিক নথি, বন্দিদের অভিযোগ, আইনজীবীদের সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই না করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগের কথাও একই সাক্ষাৎকারে এসেছে। সাক্ষাৎকারদাতার বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযোগ মূলত আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে সামনে এসেছে।
নারী অধিকার ও নাগরিক পরিসর নিয়েও উদ্বেগ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নাগরিক পরিসর সম্প্রসারিত হলেও নারী অধিকারকর্মী, তরুণী আন্দোলনকর্মী এবং যৌন ও লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি সব ক্ষেত্রে সহজ হয়নি বলে প্রতিবেদনে সংকলিত একটি সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তরুণীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেককে আন্দোলনের মূলধারা থেকে সরে যেতে দেখা যায়। কেউ পড়াশোনা ও পরিবারে ফিরে যান, কেউ সক্রিয় থাকেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকারদাতার পর্যবেক্ষণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে নারী অধিকার ও সমতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছিল। তিনি নিজেও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানান। তবে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে বলে তাঁর অভিযোগ।
একই সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছে, নাগরিক পরিসর উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রক্ষণশীল ও ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের জায়গাও বেড়েছে। এর ফলে নারী অধিকার আন্দোলন ও এলজিবিটিকিউআই-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন হয়রানি এবং সহিংসতার অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বৈষম্য, নিরাপত্তা, মানবাধিকারকর্মীদের হুমকি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। সাক্ষাৎকারদাতার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতি দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানে পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়নি।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ঘাটতির অভিযোগ
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু এসব কমিশনের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রতিবেদনে সংকলিত সাক্ষাৎকারে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ওই প্রতিনিধির বক্তব্য অনুযায়ী, নারী অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরিতে উল্লেখযোগ্য সময় ও শ্রম ব্যয় করা হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সুপারিশগুলো আইন বা কার্যকর নীতিতে রূপ দিতে পারেনি বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ।
তাঁর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় নারীর অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। নতুন সরকার কিছু সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কাজ করলেও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, এক রাতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের কারণে পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ।
পুলিশের সংস্কার নিয়েও একজন কর্মকর্তা বলেন, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ন্যায্যতা এবং মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তবে পুলিশ নিজে থেকে সব পরিবর্তন করতে পারে না, কারণ বাহিনীটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরদারি ও উদ্বেগ
ফজলে করিম চৌধুরীর মামলা, আটকাবস্থা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের কথা তাঁর পরিবারের সংকলিত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব যোগাযোগের ধরন ও গুরুত্ব এক নয়। কোনো সংস্থা মামলা পর্যবেক্ষণ করছে, কেউ চিঠি পাঠিয়েছে, কেউ কোনো বৈঠকে বিষয়টি তুলেছে, আবার কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছে। এগুলোকে একই ধরনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ: সংস্থাটি মামলার সাক্ষ্যবিবরণীতে পুনরাবৃত্তি এবং প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার গুরুত্ব জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: সংস্থাটির কর্মকর্তা রিহ্যাব মাহামুরের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা মামলাটি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বাংলাদেশের আইনমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন: সংস্থাটির মহাসচিব আন্দা ফিলিপ ফজলে করিম চৌধুরীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উদ্বেগ বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন বলে পরিবারের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন: সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও যোগাযোগে তাঁর আটকাবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা এসেছে।
ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল কেসি: পরিবারের নথি অনুযায়ী, তিনি ফজলে করিমের দীর্ঘ আটকাবস্থা এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপনের পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
ব্রিটিশ সংসদ সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান ও জিম শ্যানন: পরিবারের সংকলিত তথ্যে বলা হয়েছে, তাঁরা ফজলে করিমের মামলা নিয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
ফিলিপাইনের সাবেক সিনেটর লেইলা ডি লিমা: ১৭ সেপ্টেম্বরের একটি চিঠিতে তিনি আটকাবস্থা, চিকিৎসা, সাক্ষ্যবিবরণীর পুনরাবৃত্তি এবং ঘুষের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
আর্জেন্টিনার সাবেক সিনেটপ্রধান ফেদেরিকো পিনেদো: তিনি বাংলাদেশের আইনমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত চিঠি দিয়ে বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন বলে পরিবারের নথিতে দাবি করা হয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক উপকমিটি: ১৭ সেপ্টেম্বরের একটি চিঠিতে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণ এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
কানাডার পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার উপকমিটি: ফজলে করিমের বিষয়ে পাঠানো একটি চিঠি অনুবাদ করে সদস্যদের মধ্যে বিতরণের কথা জানিয়েছে বলে পরিবারের সংকলিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সংসদ সদস্য জেমি চ্যাফি: তিনি ফজলে করিমের পরিবারের উদ্বেগ অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংয়ের কাছে পুনরায় উত্থাপন করার কথা জানিয়েছেন বলে নথিতে বলা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ: ঘুষের অভিযোগ প্রকাশের পর সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এই প্রতিক্রিয়াগুলোর গুরুত্ব মূল্যায়নের সময় প্রত্যেকটির মূল চিঠি, বিবৃতি বা আনুষ্ঠানিক নথি দেখা প্রয়োজন। কোনো সংসদ সদস্যের চিঠি বা ব্যক্তিগত মন্তব্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সমতুল্য নয়। একইভাবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার মামলা পর্যবেক্ষণের অর্থ এই নয় যে সংস্থাটি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে।
তবে বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনজীবীদের পক্ষ থেকে একই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বিষয়টি স্বচ্ছভাবে মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ায়।