সৌদী আরবের পক্ষে কি আসলেই আধুনিকায়ন সম্ভব? আসলেই কি এ দেশের এবং সমাজের কপালে আধুনিকায়ন আছে? মোহাম্মদ বিন সালমানের “আধুনিকায়নের” বিভিন্ন উদ্যোগ দেখে অনেকেই আশাবাদী হয়েছিলেন। মনে হয়েছিল, সৌদি আরব হয়তো ধীরে ধীরে এমন একটি রাষ্ট্রের দিকে এগোয়, যেখানে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও বিচারপ্রাপ্তির সুযোগও বাড়বে। পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ, সেটি বুঝেই এসব উদ্যোগকে সম্ভাবনার জায়গা থেকে দেখেছিলাম। কিন্তু দুই বাংলাদেশির সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ড সেই আশাবাদে গভীর আঘাত করেছে। ঘটনাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের মধ্যেও রাষ্ট্রের দণ্ডচিন্তায় পুরোনো দমনমূলক কর্তৃত্ব টিকে থাকতে পারে। ধর্মীয় পবিত্রতার ভাষায় শাস্তি ব্যাখ্যা করলেই মানুষের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। বিষয়টি আসলে ক্ষমতায় থাকার কর্তৃত্ত্ববাদী ইচ্ছের কাছে বন্দী বলেই প্রতীয়মান হয়।
কিন্তু দুই বাংলাদেশির সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ড আমার সেই আশাবাদে গভীর আঘাত করেছে। ঘটনাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের মধ্যেও রাষ্ট্রের দণ্ডচিন্তায় পুরোনো দমনমূলক কর্তৃত্ব বহাল থাকতে পারে। ধর্মীয় পবিত্রতার ভাষায় শাস্তি ব্যাখ্যা করলেই মানুষের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না।
আমার কাছে ঘটনাটি আরেকটি প্রশ্নও সামনে এনেছে: তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্রের নাগরিক বলেই কি বাংলাদেশিদের অধিকারকে এত সহজে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়েছে? একই পরিস্থিতিতে ভারত কিংবা আরও প্রভাবশালী কোনো দেশের নাগরিক হলে সৌদি কর্তৃপক্ষ কি একইভাবে এগোত? এমন দন্ডের পেছনকার আসল কারন কি শুধুই অনৈতিক আচরণ, নাকি অন্য কোন বৃহৎ ঘটনার ধামাচাপা দেয়া? এসবের নিশ্চিত উত্তর আমাদের জানা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার অসমতা নাগরিকের বাস্তব সুরক্ষাকে কতটা প্রভাবিত করে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বক্ষমান প্রবন্ধে এসব প্রশ্নের ওপর সামান্য আলোকপাত করা হবে।
যা জানা যাচ্ছে, যা এখনো অজানা
সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতির ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড ১৪ অক্টোবর ২০২৬ কার্যকর হয়েছে। সংবাদে শাস্তিটিকে ‘তাজির’ বলা হয়েছে; এই নিয়মে রায়টি বিচারকের বিবেচনার ভিত্তিতে করা হয়; এটি, আমার মতে, অনেকটাই বিচারকের খেয়ালখুশিমত হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর রাজকীয় আদেশে তা কার্যকর হয়। সাধারণত এমন অপরাধের বিচার “হদ” আইনে করা হয়, যেমন প্রয়োজনীয় সাক্ষীসাবুদ (চার জনের সাক্ষ্য), প্রমান ইত্যাদির ভিত্তিতে করা হয়।
অথচ প্রকাশিত বিবরণে তাঁদের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত নেই। দুজন মানুষের জীবন শেষ হয়েছে, কিন্তু অভিযোগ, প্রমাণ ও শাস্তির যৌক্তিকতা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয় তথ্য জনসমক্ষে পর্যাপ্তভাবে আসেনি। প্রকাশিত বিবরণে তাঁদের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত নেই। তাঁদের প্রত্যেকের আইনজীবী ছিলেন কি না, উপযুক্ত দোভাষী পেয়েছিলেন কি না, কোনো স্বীকারোক্তি ব্যবহৃত হলে তা কীভাবে নেওয়া হয়েছিল—এসবের উত্তর প্রয়োজন। নারীটির সম্মতি বা সম্ভাব্য জবরদস্তির বিষয় কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটিও জানতে হবে। প্রশ্ন তোলা মানে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি ঘটেছিল বলে ধরে নেওয়া নয়।
মানুষের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্তে এতগুলো মৌলিক বিষয় অজানা থাকা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এখন আমাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে বলেই তার ঘোষিত ব্যাখ্যাকে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করতে হবে কেন? বিশেষ করে যখন শাস্তি এত কঠোর, তথ্য এত সীমিত কেন? বাংলাদেশের কনস্যুলার দায়িত্ব পালন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
হদ ও তাজির: বিচারিক বিবেচনা এবং মৃত্যুদণ্ডের আনুপাতিকতা
এই মৃত্যুদণ্ডের মূল্যায়নে ইসলামী ফৌজদারি বিচারধারায় ‘হদ’ ও ‘তাজিরের’ পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। হদ, যার বহুবচন হুদুদ, বলতে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য ধর্মীয় উৎসের ভিত্তিতে নির্ধারিত শাস্তিকে বোঝায়। প্রচলিত ফিকহে এসব শাস্তি প্রয়োগের জন্য অপরাধের সংজ্ঞা, প্রমাণ এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয়। তবে বিস্তারিত বিধান ও ব্যাখ্যায় মাযহাবভেদে পার্থক্য রয়েছে।
তাজির হলো এমন শাস্তি, যার ধরন ও মাত্রা হদের মতো পূর্বনির্ধারিত নয়; প্রযোজ্য আইন ও বিচারধারার মধ্যে বিচারক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তা নির্ধারণ করেন। নির্দিষ্ট হদ নেই এমন অপরাধে এবং কিছু বিচারধারায় হদ প্রয়োগের শর্ত পূরণ না হলেও পৃথকভাবে শাস্তিযোগ্য আচরণ প্রতিষ্ঠিত হলে তাজিরের প্রশ্ন আসতে পারে। তাজিরের পরিসর ও সর্বোচ্চ সীমা নিয়েও ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। ফলে একে সীমাহীন ব্যক্তিগত ক্ষমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।
দুই বাংলাদেশির ঘটনায় প্রকাশিত সংবাদে শাস্তিটিকে তাজির বলা হয়েছে। তাই এটিকে হদের অধীনে নির্ধারিত, অবধারিত মৃত্যুদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। আবার শুধু তাজির বলা হয়েছে বলেই হদের প্রমাণের শর্ত পূরণ হয়নি—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যাবে না। পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ ও রায় ছাড়া আমরা জানি না, আদালত ঠিক কোন অপরাধ এবং কোন আইনগত যুক্তিতে এই শাস্তি নির্ধারণ করেছেন।
এখানেই বিচারিক বিবেচনার জবাবদিহি জরুরি হয়ে ওঠে। শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের সুযোগ থাকলে কম কঠোর বিকল্প বিবেচনার প্রশ্নও আসে। কারাদণ্ড, জরিমানা কিংবা অন্য কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থা কেন অপর্যাপ্ত বিবেচিত হলো? মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ কীভাবে মানুষের জীবন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করল? আদালতকে সেই যুক্তি স্পষ্ট করতে হবে।
২০০৪ সালের আরব মানবাধিকার সনদের ৬ অনুচ্ছেদ মৃত্যুদণ্ডকে ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের’ মধ্যে সীমিত রাখে। সৌদি আরব এই সনদ অনুসমর্থন করেছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচও উল্লেখ করেছে। বর্তমান ঘটনার প্রকাশিত বর্ণনায় প্রাণহানির অভিযোগ নেই। ফলে অপরাধের গুরুত্ব, শাস্তির প্রয়োজনীয়তা এবং এই আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সামঞ্জস্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ ও রায় ছাড়া অপরাধের চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে প্রকাশিত ব্যাখ্যায় মৃত্যুদণ্ডের আনুপাতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমার কাছে এটি অতিরিক্ত কঠোরতা ও বিচারিক নি ষ্ঠুরতা গুরুতর প্রশ্ন তোলে। তাজিরে বিচারিক বিবেচনার সুযোগ থাকার অর্থই হলো, সিদ্ধান্তটির মানবিক ও আইনগত দায় এড়াতে একে শুধু ‘অনিবার্য ধর্মীয় শাস্তি’ বলে আলোচনা শেষ করা যায় না।
লঘু পাপে গুরুদণ্ডের প্রশ্নঃ আগের রায়গুলো কেমন ছিলো?
অভিযোগের পূর্ণ বিবরণ ছাড়া ঘটনাটিকে নিশ্চিতভাবে লঘু অপরাধ বলা না গেলেও ইঙ্গিতটি সেদিকেই যায়। কিন্তু ‘অনৈতিকতা’ ও পবিত্রতা লঙ্ঘনের যে ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, তা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োজনীয়তাও প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেন কারাদণ্ড, জরিমানা কিংবা অন্য কোনো আইনসম্মত কম কঠোর ব্যবস্থা যথেষ্ট বিবেচিত হলো না? মানুষের জীবন নেওয়াই কেন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল?
তাজিরের ক্ষেত্রে শাস্তি নির্ধারণে বিচারিক বিবেচনার ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই মৃত্যুদণ্ডকে অবধারিত, অপরিবর্তনীয় ধর্মীয় নির্দেশের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। বিচারিক বিবেচনার সুযোগ থাকলে সংযমের দায়িত্বও থাকে। সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা এবং সেই শাস্তির ন্যায্যতা পৃথক বিষয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় ছাড়া বিচারকের সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে প্রকাশিত ব্যাখ্যায় মৃত্যুদণ্ডের আনুপাতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমার মূল্যায়নে, এটি অতিরিক্ত কঠোরতা এবং বিচারিক নিষ্ঠুরতার গুরুতর প্রশ্ন তোলে। দেখা যাক আগের এ ধরনের কয়েকটি ঘটনায় সৌদী আরবের বিচার বিভাগ কী ধরনের রায় দিয়েছিলো।
সৌদি আরবে যৌন নৈতিকতাসংক্রান্ত কাছাকাছি অভিযোগে প্রাণদণ্ডের বিকল্প ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে মসজিদের ভেতরে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সরাসরি তুলনাযোগ্য পুরোনো রায় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নিচের ঘটনাগুলো সেই সীমা মনে রেখেই দেখতে হবে।
| ঘটনা ও সময় |
অভিযোগ বা পরিস্থিতি |
শাস্তি বা পরবর্তী ফলাফল |
আমাদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিকতা ও সীমা |
| মক্কা, ২০১৪: বিবাহবিচ্ছিন্ন নারী |
বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর গর্ভবতী অবস্থায় ফিরে আসেন; সংবাদে অভিযোগকে ব্যভিচার বলা হয়। |
মক্কা আপিল আদালত ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ১০০ বেত্রাঘাত দেয়। |
যৌন নৈতিকতাসংক্রান্ত অভিযোগে প্রাণদণ্ডের বিকল্প ব্যবহারের নজির। মসজিদে ঘটনার উল্লেখ নেই। (www.arabnews.com) |
| জেদ্দা, ২০০৯: ধর্ষণের অভিযোগকারী নারী |
গণধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন; সংবাদ অনুযায়ী আদালত তাঁকেই ব্যভিচারের অভিযোগে সাজা দেয়। |
১ বছরের কারাদণ্ড ও ১০০ বেত্রাঘাত। |
সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে দণ্ড দেওয়ার গুরুতর উদাহরণ। সম্মতিমূলক সম্পর্কের মামলা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। (www.upi.com) |
| ২০০২ সালে প্রকাশিত যৌন সম্পর্কের মামলা |
এক পুরুষের বিরুদ্ধে তাঁর ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ; নারীর বক্তব্যে ভয় দেখিয়ে চাপ দেওয়ার বিষয়ও ছিল। |
পুরুষকে ৬ বছরের কারাদণ্ড ও ৪,৭৫০ বেত্রাঘাত; নারীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ৬৫ বেত্রাঘাত। |
সম্পর্কিত অভিযোগে ভিন্ন মাত্রার শাস্তির নজির। কানাডার Immigration and Refugee Board-এর নথিতে সংবাদ উদ্ধৃত হয়েছে; সরাসরি রায়ের নথি নয়। (www.justice.gov) |
| দাহরান, ১৯৯৬–১৯৯৮: দুই ব্রিটিশ নার্স |
অস্ট্রেলীয় নার্স ইভন গিলফোর্ড হত্যার ঘটনায় ডেবোরা প্যারি ও লুসিল ম্যাকলাফলান অভিযুক্ত হন। |
দুজনের সাজা এক ছিল না। ম্যাকলাফলানের ৮ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০০ বেত্রাঘাত হয়েছিল। প্যারির মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর ক্ষেত্রে নিহতের পরিবারের ক্ষমা ও অর্থসমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯৮ সালে রাজকীয় সিদ্ধান্তে দুজন মুক্তি পান। |
আইনজীবী, কনস্যুলার উপস্থিতি, পরিবারের যোগাযোগ এবং ক্ষমার সুযোগের তুলনা। হত্যা মামলার দিয়াতকে বর্তমান তাজির মামলার সরাসরি বিকল্প বলা যাবে না। (www.the-independent.com) |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত, ২০০৭–২০১০: ছয় বাংলাদেশি শ্রমিক |
পাকিস্তানি এক নাগরিককে হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ড হয়। |
বাংলাদেশ সরকার ২ লাখ দিরহাম, তৎকালীন প্রায় ৩৮ লাখ টাকা, দিয়াত দেওয়ার পর ছয়জন দেশে ফেরেন। |
নাগরিকের পক্ষে বাংলাদেশের সক্রিয় উদ্যোগের নজির। এটি সৌদির মামলা নয়; তাজির মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না। (www.thedailystar.net) |
| সৌদি আরব, ২০১৮: তুতী তুরসিলাওয়াতি |
ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মী হত্যা মামলায় দণ্ডিত ছিলেন। |
২৯ অক্টোবর ২০১৮ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আগাম নোটিশ না পাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেন। |
মৃত্যুদণ্ডের আগে নিজ দেশের সরকারকে অবহিত করা নিয়ে আগের বিরোধের নজির। ইন্দোনেশিয়া মামলাটি একেবারেই জানত না—এমন দাবি করা যাবে না। (www.antaranews.com) |
| সৌদি আরব, ২০২১: আবিরন বেগম হত্যা মামলা |
বাংলাদেশি গৃহকর্মীকে হত্যার অভিযোগে সৌদি নিয়োগকর্ত্রী ও অন্যরা অভিযুক্ত হন। |
নিয়োগকর্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড, অন্য অভিযুক্তদের বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়। |
নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তির নজির আছে। ফলে ‘কোনো নিয়োগকর্তার কখনো বিচার হয়নি’ বলা ভুল। এখানে রায় এবং রায় কার্যকর হওয়ার বিষয়ও আলাদা। (bdnews24.com) |
| সৌদি আরব, অক্টোবর ২০২৬: আনোজান সিভারাসা |
ফেসবুক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শ্রীলঙ্কান নাগরিক মৃত্যুদণ্ড পান। |
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের পর ১৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে। |
সময়মতো আইনি সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের গুরুত্ব দেখায়। মৃত্যুদণ্ড বাতিল মানেই খালাস বা মুক্তি নয়; আদালত শুধু রাজনৈতিক চাপে সিদ্ধান্ত দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও প্রতিষ্ঠিত নয়। (www.khaleejtimes.com) |
| মক্কা অঞ্চল, ২০২৬: নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার |
মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’; অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি। |
তাজিরের অধীনে মৃত্যুদণ্ড, কার্যকর ১৪ অক্টোবর। বাংলাদেশ মিশনের সূত্র আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত না হওয়ার কথা জানিয়েছে। |
শাস্তির আনুপাতিকতা, প্রতিরক্ষার সুযোগ ও কনস্যুলার অধিকার নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। (english.ajel.sa) |
এই ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে সব মামলাকে একই আইনি শ্রেণিতে ফেলা যায় না। হত্যা মামলার কিসাস ও দিয়াত, যৌন নৈতিকতাসংক্রান্ত অভিযোগ এবং তাজিরের অধীনে মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি পৃথক। কিন্তু তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আনে: কারা কার্যকর আইনজীবী ও কনস্যুলার সহায়তা পেয়েছেন, কোথায় কম কঠোর শাস্তি বা ক্ষমার সুযোগ ব্যবহৃত হয়েছে এবং কোন রাষ্ট্র তার নাগরিকের পক্ষে সক্রিয় হয়েছে?
ব্রিটিশ নার্সদের মামলায় তুলনামূলক উন্মুক্ত প্রক্রিয়া ও সহায়তার বিবরণ রয়েছে। বাংলাদেশ অতীতে আমিরাতে ছয় নাগরিকের পক্ষে উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ঘটনাও দেখায়, সীমিত শক্তির রাষ্ট্রের আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এসব উদাহরণ বর্তমান দুই বাংলাদেশির জন্য একই ফল নিশ্চিত করত না; তবে তাঁদের ক্ষেত্রে কী সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো করে।
আমার সন্দেহের জায়গা হলো, শাস্তির কঠোরতার সঙ্গে অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকাশিত ব্যাখ্যার বিস্তর ফাঁক। এটি অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্যের প্রমাণ কিনা কে জানে। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ রায়, প্রতিরক্ষার বিবরণ এবং কনস্যুলার যোগাযোগের নথি চাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকেও ব্যাখ্যা করতে হবে, নাগরিকের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা কোথায় কার্যকর ছিল এবং কোথায় ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান মামলায় কোন অতিরিক্ত পরিস্থিতি মৃত্যুদণ্ডকে প্রয়োজনীয় করে তুলল? স্থানটির পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি কীভাবে কম কঠোর শাস্তির সম্ভাবনাকে অতিক্রম করল? এই পার্থক্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। তবে এই রায়ের ফলে বিবেকবান মানুষের মনে বিচারের প্রতি একটি অনাস্থা তৈরী হওয়ার কথা, কারন বিচারব্যবস্থায় “Precedence” বলে একটি বিষয় আছে যেটির কিছু উদাহরণ ওপরের সারনীতে দেখানো হয়েছে; বক্ষ্যমাণ রায়ে এই Precedence বিষয়টির কোন প্রতিফলন দেখা যায়না। পুরো রায় এবং বিচার কার্যকর কেমন যেন রহস্যের ইঙ্গিত দেয়। মনে হয়, আসল কারন অনৈতিকতা নয়, অন্যকিছু।
দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের সমাজতত্ত্ব
এমিল দুর্খেইমের ‘দমনমূলক আইন’ বা repressive law ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক। তাঁর বিশ্লেষণে, প্রতিষ্ঠিত নৈতিক বিশ্বাসকে আঘাত করার প্রতিক্রিয়ায় শাস্তি সমষ্টিগত ক্ষোভ প্রকাশ এবং সেই বিশ্বাসের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যম হতে পারে। এই দৃষ্টিতে প্রশ্ন ওঠে, বাস্তব ক্ষতি ও শাস্তির আনুপাতিকতার তুলনায় পবিত্রতা রক্ষার নামে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার তাগিদ কতটা প্রাধান্য পেয়েছে? এটি একটি বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন, বিচারকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।
মিশেল ফুকোর ক্ষমতাবিষয়ক আলোচনায় মানুষের জীবন নেওয়ার অধিকার সার্বভৌম ক্ষমতার ঐতিহাসিক প্রকাশ হিসেবে উঠে আসে। সেই দৃষ্টিতে মৃত্যুদণ্ড রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্বের বার্তাও বহন করতে পারে। আমার মতে, সৌদি রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হলো দণ্ড ও ভয়ের মাধ্যমে কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রবণতা। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিচারিক মানবিকতা ও জবাবদিহির সামঞ্জস্য তৈরি না হলে আধুনিকতা অসম্পূর্ণ থাকে। এই ঘটনাকে আমি আধুনিকতার ভেতরে মধ্যযুগীয় দণ্ডচিন্তার উদ্বেগজনক উপস্থিতি হিসেবে দেখি।
ব্রিটিশ নার্সদের ঘটনা: বৈষম্যের প্রশ্ন, তুলনার সীমা
১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলীয় নার্স ইভন গিলফোর্ড হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত দুই ব্রিটিশ নার্সের সাজা এক ছিল না। লুসিল ম্যাকলাফলানের আট বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচশ বেত্রাঘাত হয়েছিল। অন্য অভিযুক্ত ডেবোরা প্যারির ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন এবং নিহতের পরিবারের ক্ষমা ও অর্থসমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯৮ সালে রাজকীয় সিদ্ধান্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। সমসাময়িক মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদনে এই মামলায় তুলনামূলক উন্মুক্ত বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবীর কার্যকর অংশগ্রহণ, কনস্যুলার উপস্থিতি ও পরিবারের প্রবেশাধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই উদাহরণে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয় শুধু শেষ পর্যন্ত মুক্তি নয়; অভিযুক্তরা কী ধরনের আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা পেয়েছিলেন, সেটিও।
মেরি কার্টার ডানকানের ১৯৯৮ সালের Playing by Their Rules: The Death Penalty and Foreigners in Saudi Arabia নামের গবেষণাপত্রটির মতে, সৌদী আরবে আজ পর্যন্ত কোনো শ্বেতাঙ্গের মৃত্যুদণ্ড হয়নি। কেন? এখানে কি কোনভাবে লুক্কায়িত বর্নবাদ (Hidden Racism) কাজ করেছিলো? কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষমতাবলয়ে একটি দেশের অবস্থানের ওপর তার নাগরিকদের সুবিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করে?
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ: উদ্যোগের গুরুত্ব
২০১০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি দেশে ফিরেছিলেন। সমসাময়িক সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার নিহত ব্যক্তির পরিবারকে দুই লাখ দিরহাম, তখন প্রায় ৩৮ লাখ টাকা, দিয়াত দিয়েছিল। এটি সৌদি আরবের মামলা নয় এবং বর্তমান তাজির মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি আইনি নজিরও নয়। তবে নাগরিকের পাশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের গুরুত্ব দেখায়।
আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ শ্রীলঙ্কার আনোজান সিভারাসা। দেশটির সরকারি প্রতিনিধির বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ সৌদি সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করেছে। সংবাদে ধারাবাহিক আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা এসেছে। মৃত্যুদণ্ড বাতিল হওয়া এবং সম্পূর্ণ খালাস বা মুক্তি পাওয়া অবশ্য এক বিষয় নয়।
ভিয়েনা কনভেনশন: কোন দায়িত্বের উত্তর প্রয়োজন?
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মিশনের সূত্র জানিয়েছে, দুই ব্যক্তির আটক, বিচার ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি। প্রতিবেদনে ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান একে ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। অন্যদিকে ভিন্ন আইনি ব্যাখ্যাও এসেছে। ফলে বিশেষজ্ঞের অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠিত আইনি সিদ্ধান্তকে পৃথক রাখতে হবে।
এখানে প্রাসঙ্গিক চুক্তি হলো ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন।
| বিষয় ও বিধান |
সৌদি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব |
বাংলাদেশের বক্তব্য ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী অবস্থান |
সম্ভাব্য লঙ্ঘন ও যাচাইয়ের প্রশ্ন |
| বন্দিকে অধিকার জানানো—৩৬(১)(খ) |
কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার বিলম্ব ছাড়াই জানানো। |
অধিকার জানানো হয়েছিল কি না, স্পষ্ট তথ্য প্রকাশিত হয়নি। |
না জানালে বিধান লঙ্ঘনের ভিত্তি তৈরি হবে। কখন, কোন ভাষায় জানানো হয়েছিল—নথি প্রয়োজন। |
| কনস্যুলেটকে খবর দেওয়া—৩৬(১)(খ) |
বন্দি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে বিলম্ব ছাড়াই জানানো। |
মিশনের সূত্রের দাবি, গ্রেপ্তারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। |
বন্দিরা অনুরোধ করেছিলেন কি না জানতে হবে। অনুরোধ সত্ত্বেও না জানালে লঙ্ঘন হবে। |
| বন্দির বার্তা পৌঁছানো—৩৬(১)(খ) |
কনস্যুলেটের উদ্দেশে বন্দির যোগাযোগ বিলম্ব ছাড়াই পৌঁছে দেওয়া। |
তাঁরা বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন কি না, জানা যায়নি। |
বার্তা আটকানো বা অযথা বিলম্বের প্রমাণ প্রয়োজন। |
| সাক্ষাৎ ও সহায়তা—৩৬(১)(গ) |
কনস্যুলার সাক্ষাৎ, যোগাযোগ ও আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করার অধিকার কার্যকর হতে দেওয়া; বন্দির সুস্পষ্ট আপত্তিও বিবেচ্য। |
মিশন বিচার সম্পর্কে না জানার কথা বলছে; বন্দিদের আইনি সহায়তার পূর্ণ তথ্য নেই। |
যোগাযোগে বাধা ছিল কি না এবং বন্দিরা কী চেয়েছিলেন, যাচাই প্রয়োজন। |
| মৃত্যুর সংবাদ—৩৭(ক) |
মৃত্যুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে বিলম্ব ছাড়াই জানানো। |
প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত মিশনের সূত্র আনুষ্ঠানিক তথ্য না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। |
কখন আনুষ্ঠানিক সংবাদ পাঠানো হয়েছে, তার রেকর্ড প্রয়োজন। এই দায়িত্ব বন্দির অনুরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়। |
এগুলো কনভেনশনের পৃথক দায়িত্ব। শুধু মৃত্যুদণ্ডের আগাম খবর না দেওয়ার তথ্য থেকে প্রতিটি বিধান লঙ্ঘনের সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। আবার ‘বন্দিরা যোগাযোগ চাননি’ বললেও তাঁদের অধিকার জানানোর দায়িত্বটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই প্রশ্নগুলো গুরুতর, কারণ কনস্যুলার যোগাযোগ বিদেশে আটক ব্যক্তির জন্য পরিবার, আইনজীবী ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ পথ। মৃত্যুদণ্ডের মামলায় সেই সুযোগ ব্যাহত হয়ে থাকলে ক্ষতি আর সংশোধন করা যায় না।
দুর্বল দেশের নাগরিক বলেই কি এমন আচরণ?
এই ঘটনার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার অসমতা। আন্তর্জাতিক আইনে নাগরিকের কনস্যুলার অধিকার তাঁর দেশের অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হয় না। কিন্তু বাস্তবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা কর্তৃপক্ষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
আমার ধারণা, ভারত কিংবা আরও প্রভাবশালী কোনো দেশের নাগরিক হলে এমন যোগাযোগহীনতার রাজনৈতিক মূল্য সৌদি কর্তৃপক্ষকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে হিসাব করতে হতো। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত তুলনার পরিবর্তে ক্ষমতার অসমতা নিয়ে একটি প্রশ্ন হিসেবেই রাখছি। বাংলাদেশের তুলনামূলক সীমিত কূটনৈতিক প্রভাব এবং সৌদি শ্রমবাজারের গুরুত্ব কি এই দুই ব্যক্তির অধিকারকে বাস্তবে দুর্বল করে দিয়েছে? সৌদি কর্তৃপক্ষ কি ধরে নিয়েছে, বাংলাদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা কম? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান প্রয়োজন।
বিবিসির প্রতিবেদনে শরীফুল হাসানও প্রশ্ন তুলেছেন, এই দুই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলে সৌদি কর্তৃপক্ষ একইভাবে এগোতে পারত কি না। আমার মতে, এটি বৈষম্যের প্রমাণ, এবং নাগরিকের জাতীয় পরিচয় অনুযায়ী বাস্তব সুরক্ষায় পার্থক্য হচ্ছে সৌদী আরবে, এটি মোটামুটি পরিষ্কার। কোনো দেশের নাগরিককে ক্ষমতাহীন ভেবে তাঁর অধিকার কম গুরুত্ব দেওয়া হলে সেটি রাষ্ট্রীয় ঔদ্ধত্যের প্রকাশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তার নাগরিকের জীবনের মূল্য কমায় না।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে আমার উদ্বেগ বাড়িয়েছে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া। তিনি ঘটনাটিকে ‘আমাদের জন্য একটা শিক্ষা’ বলেছেন; একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং বিস্তারিত জানতে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু আমার মতে, দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল তাঁদের ন্যায়বিচার, কনস্যুলার অধিকার এবং শাস্তির আনুপাতিকতা নিয়ে দৃঢ় প্রশ্ন। পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে শাস্তি হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা নাগরিকের সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে। বিদেশের আইন মানার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে; পাশাপাশি সেই রাষ্ট্রেরও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশকে অবহিত না করার অভিযোগের ব্যাখ্যা চাওয়া এবং অধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো কূটনৈতিক দায়িত্ব। এখানে দেশের মর্যাদা জড়িত, কারণ রাষ্ট্রের সম্মান তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও প্রকাশ পায়। আমার দৃষ্টিতে, এই সংযত প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির পরিচয় দেয়। কোনো শিক্ষা নিতে হলে সেটি হবে নাগরিকের আইনি সুরক্ষা শক্তিশালী করার শিক্ষা; দুই নাগরিকের মৃত্যু ও উত্তরহীন প্রশ্নগুলোকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার শিক্ষা নয়।
নারী গৃহকর্মীর মর্যাদা রক্ষায় কঠোরতা কোথায়?
সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের Locked in, Left out প্রতিবেদনে কেনীয় নারী গৃহকর্মীদের যৌন ও শারীরিক নির্যাতন, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং গুরুতর শোষণের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ হয়েছে। জুলাই ২০২৬-এর বিবৃতিতে সংগঠনটি ফিলিপিনো নারী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রেও শোষণ এবং কিছু ঘটনায় যৌন সহিংসতার কথা তুলে ধরে।
বাংলাদেশি নারীদের অভিযোগও রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনসংক্রান্ত খবরে বলা হয়, ২৬ আগস্ট ফিরে আসা ১১০ নারী গৃহকর্মীর মধ্যে ৩৮ জনের ক্ষেত্রে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের তথ্য ছিল। এটি নির্দিষ্ট একটি দলের তথ্য, সব নারী কর্মীর বা প্রতিবছরের নির্যাতনের হার নয়।
আমার সন্দেহ, আমার চ্যালেঞ্জ
শাস্তির কঠোরতা, অভিযোগের অস্পষ্টতা এবং কনস্যুলার যোগাযোগের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে আমার প্রশ্ন: প্রকাশিত ব্যাখ্যায় কি সিদ্ধান্তটির সব প্রাসঙ্গিক কারণ উঠে এসেছে? অন্য কোনো অপ্রকাশিত বিবেচনা ছিল কি? এই সন্দেহ নথি ও স্বাধীন যাচাই চাওয়ার কারণ। কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে হবে, এত দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ কেন হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে।
আমি সৌদি রাষ্ট্রের ঘোষিত ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করছি, কারণ মানুষের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্তে অসম্পূর্ণ বিবরণ যথেষ্ট নয়।
পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র এত কঠোর হলে দরিদ্র গৃহকর্মীর শরীর, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? যে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকা মানুষেরা এপ্সটাইনের সাথে সম্পর্কিত, সারা পৃথিবীতে যথেচ্ছারী ব্যভিচারী আচরণের জন্য প্রসিদ্ধ, নিজেদের বাসভবনে গৃহকর্মীদের নির্যাতন ও ধর্ষনে অভ্যস্ত, রোনালদো যে দেশে বিবাহ-বহির্ভূত প্রেমিকাকে নিয়ে জীবন যাপন করেন, সে দেশে দু’জন নিরীহ মানুষের ওপর আইনী সন্ত্রাস চালিয়ে তাদের খুন করা দেখেই দেশটি যে এখনো অসভ্য দেশের তালিকায় আছে তা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। এর পেছনের কারণটি, আমার ধরনা, আরো গভীর ও জটিল। এরা কোন বড় পাপের সাক্ষী ছিলোনা তো? কিংবা মেয়েটি তার ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করে আইনী সুরক্ষা চাওয়ার হুমকি দেয়নিতো? এসব বিষয়ে একটি শক্ত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দায়িত্ব
বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে আমার উদ্বেগ বাড়িয়েছে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া। তিনি ঘটনাটিকে ‘আমাদের জন্য একটা শিক্ষা’ বলেছেন; একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং বিস্তারিত জানতে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু আমার মতে, দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল তাঁদের ন্যায়বিচার, কনস্যুলার অধিকার এবং শাস্তির আনুপাতিকতা নিয়ে দৃঢ় প্রশ্ন। পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে শাস্তি হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা নাগরিকের সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে। বিদেশের আইন মানার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে; পাশাপাশি সেই রাষ্ট্রেরও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশকে অবহিত না করার অভিযোগের ব্যাখ্যা চাওয়া এবং অধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো কূটনৈতিক দায়িত্ব। এখানে দেশের মর্যাদা জড়িত, কারণ রাষ্ট্রের সম্মান তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও প্রকাশ পায়। আমার দৃষ্টিতে, এই সংযত প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির পরিচয় দেয়। কোনো শিক্ষা নিতে হলে সেটি হবে নাগরিকের আইনি সুরক্ষা শক্তিশালী করার শিক্ষা; দুই নাগরিকের মৃত্যু ও উত্তরহীন প্রশ্নগুলোকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার শিক্ষা নয়।
বাংলাদেশের উচিত আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ উত্তর চাওয়া। দুই ব্যক্তির পরিচয়, গ্রেপ্তারের তারিখ, অভিযোগ, আইনি সহায়তা, কনস্যুলার অধিকার জানানোর নথি, রায়ের যুক্তি এবং মরদেহের অবস্থান ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়া জানতে হবে। সৌদির বিচারিক এখতিয়ার স্বীকার করেও নাগরিকের অধিকার নিয়ে দৃঢ় প্রশ্ন তোলা যায়। শ্রমবাজার, প্রবাসী আয় ও আর্থিক সম্পর্কের গুরুত্ব সেই দায়িত্ব কমায় না। তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর প্রয়োজন উত্তর অনুসরণ, নথি যাচাই এবং দায়িত্ব লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে যথাযথ কূটনৈতিক প্রতিকার দাবি করা।
সালমানের আধুনিকায়ন নিয়ে আমার আশাবাদ ছিল মানবিক রাষ্ট্রের দিকে অগ্রগতির প্রত্যাশা। তার পরীক্ষা হবে ক্ষমতার সংযম, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং দুর্বল মানুষের সুরক্ষায়। সৌদি নেতৃত্বকে সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। বাংলাদেশকেও দেখাতে হবে, তার নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে অর্থনৈতিক দুর্বলতা নীরবতার অজুহাত হতে পারে না। দুজন মানুষের জীবন আর ফিরবে না; কিন্তু কেন তাঁদের জীবন নেওয়া হলো, তার পূর্ণ ও যাচাইযোগ্য উত্তর দাবি করার অধিকার আমাদের রয়েছে।