পাঁচগাঁওয়ের লাল রঙের দুর্গাপ্রতিমা। ছবি : সংগৃহীত
লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমা, আর তাঁর হাতে বধ হচ্ছে সবুজ রঙের অসুর। ব্যতিক্রমী এই রূপ দেখতে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে ভিড় করছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গাপূজাকে ঘিরে রোববার (১৮ অক্টোবর) পাঁচগাঁও দুর্গামণ্ডপ পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
পাঁচগাঁও গ্রামের এই পূজা স্থানীয়ভাবে লাল দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। মণ্ডপ কমিটি ও স্থানীয়দের দাবি, বাংলাদেশে লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমা আর কোথাও নেই।
মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থী এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা দেখতে আসেন।
প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্য
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪১৫ বঙ্গাব্দে পাঁচগাঁও গ্রামে নতুন করে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে পূজা শুরু হয়। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই ঐতিহ্য।
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপূজাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে একটি কাহিনি। কথিত আছে, সর্বানন্দ দাস নামের এক সাধক আসামের শিবসাগরে মুন্সি পদে চাকরি করতেন।
একবার তিনি আসামের কামরূপ-কামাখ্যায় গিয়ে পূজার জন্য পাঁচ বছরের একটি কন্যাশিশু চান। স্থানীয় লোকজন তাঁকে একটি শিশুকন্যা দিলে তিনি তার পূজা শুরু করেন।
পূজার একপর্যায়ে সাধক লক্ষ করেন, শিশুটির গায়ের রং ধীরে ধীরে লাল হয়ে যাচ্ছে। এতে বিস্মিত হয়ে তিনি শিশুটির মধ্যে দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে বলে উপলব্ধি করেন।
কথিত আছে, এরপর দেবী তাঁকে বর চাইতে বললে সর্বানন্দ দাস পাঁচগাঁওয়ে দেবীর আবির্ভাব কামনা করেন। দেবী তখন নির্দেশ দেন, পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপ্রতিমার রং হবে লাল। সেই বিশ্বাস থেকেই এই পূজার প্রচলন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পাঁচগাঁওয়ের লাল রঙের দুর্গাপ্রতিমা। ছবি : সংগৃহীত
বংশপরম্পরায় প্রতিমা নির্মাণ
পাঁচগাঁও দুর্গামন্দিরের প্রতিমা তৈরির কারিগর অশোক আচার্য জানান, তাঁর দাদা ও বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় তিনিও লাল দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ করছেন।
অশোক আচার্য বলেন, দেশের অন্যান্য দুর্গাপ্রতিমার তুলনায় পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা আলাদা। এ প্রতিমা দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তরা আসেন। ভারতের আসাম ও কামাখ্যা অঞ্চলেও বর্তমানে লাল বর্ণের প্রতিমা রয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহসম্পাদক সুমন কল্যাণ ভট্টাচার্য বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা রূপ ও রঙের দুর্গাপ্রতিমা দেখা গেলেও পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপ্রতিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। প্রতিবছর এখানে বিপুলসংখ্যক ভক্ত সমবেত হন।
মুক্তিযুদ্ধেও থামেনি পূজার ঐতিহ্য
বর্তমানে পাঁচগাঁও মন্দিরে পূজা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ বংশধর সঞ্জয় দাস। তিনি জানান, এটি তাঁদের পারিবারিক দুর্গাপূজা। পূর্বপুরুষের সময় থেকে চলে আসা ঐতিহ্য তাঁরা ধরে রেখেছেন।
সঞ্জয় দাস বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সে বছর ঘটপূজার মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়েছিল।
মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় মোট ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৮৯৮টি সর্বজনীন ও ১২৪টি ব্যক্তিগত পূজামণ্ডপ। এসব আয়োজনের মধ্যে পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপূজা তার ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।