বাংলাদেশ

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: ‘জানতাম না’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ কতটা?

  • 4:32 pm - October 19, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০৩ বার
সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড। ছবিঃ সংগৃহীত

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা। রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশের বড় কূটনৈতিক মিশন থাকা সত্ত্বেও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে দূতাবাস অবগত ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহের মতে, দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে ‘জানতাম না’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে সাবেক কূটনীতিক মাহফুজুর রহমান বলছেন, আটক ব্যক্তির সম্মতি না থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দূতাবাসকে তথ্য না–ও জানাতে পারে স্বাগতিক দেশ।

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘিরে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে প্রবাসী নাগরিকদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের ভূমিকা। সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে এলেও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশন আগে থেকে এ সম্পর্কে জানত কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

ঘটনার বিস্তারিত জানতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ সরকার। রোববার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। এ ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রদূতকে ‘তলব’ না বলে তথ্য জানার উদ্দেশ্যে বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা।

এর আগে, গত বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়। রোববারের বৈঠকেও ওই কূটনৈতিক পত্রের একটি অনুলিপি সৌদি রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সৌদি প্রেস এজেন্সি দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করেছিল। সৌদি আইনে ওই কাজ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে।

তবে দুই বাংলাদেশির পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের দূতাবাসকে জানানো হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

দূতাবাসের দায়িত্ব কতটা?

সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ মনে করেন, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলার পরও সংশ্লিষ্ট মিশন এ বিষয়ে কিছু জানত না বলে দাবি করলে দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা কঠোর এবং সেখানে বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই শাস্তি কার্যকর করা হয়। তাঁর মতে, এত বড় একটি মামলার বিষয়ে দূতাবাস কিছুই জানত না, এমন দাবি সহজে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

গোলাম মসিহের ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশের মিশনে আইনি সহায়তা ও মামলার খোঁজখবর নেওয়ার দায়িত্বে একাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের কাজের মধ্যে রয়েছে আদালতে গিয়ে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা, কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া।

তিনি বলেন, দূতাবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি নিয়মিতভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা। তাঁর মতে, যথাযথভাবে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হলে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ থাকে না।

গোলাম মসিহের বক্তব্যের মূল প্রশ্নটি হলো, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত হলে তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে দূতাবাস কতটা সক্রিয়ভাবে খোঁজ রাখে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মিশনের নজরদারি, আইনি সহায়তা এবং তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তবে দূতাবাসের কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এ ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, সংশ্লিষ্ট মিশনের নথিপত্র এবং মামলার সময়রেখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দূতাবাস সব সময় জানতে পারে না: সাবেক কূটনীতিক

সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করা সাবেক কূটনীতিক মাহফুজুর রহমান।

তাঁর মতে, কোনো নাগরিক বিদেশে আটক হলেই যে তাঁর দেশের দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি পুলিশি হেফাজতে যাওয়ার পর নিজ দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান কি না, তা জানতে চাওয়া হতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দূতাবাসকে না জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তাহলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাগতিক কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে অবহিত না–ও করতে পারে।

বিবিসি বাংলাকে মাহফুজুর রহমান বলেন, বিদেশে অপরাধে জড়িত হওয়ার অভিযোগে আটক কোনো ব্যক্তি কখনো কখনো চান না যে তাঁর দেশের দূতাবাস বিষয়টি জানুক। সৌদি আরবের এই দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছিল কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন কি না, কিংবা সৌদি কর্তৃপক্ষ অন্য কোনো কারণে তথ্য জানায়নি কি না, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে।

তবে মাহফুজুর রহমানের এই ব্যাখ্যা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে, আলোচ্য দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও দূতাবাসকে না জানানোর বিষয়টি ঘটেছিল। এটি সম্ভাব্য একটি ব্যাখ্যা মাত্র। নির্দিষ্ট ঘটনায় কী ঘটেছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট নথি ও সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরে চলছিল বিচারপ্রক্রিয়া?

এই ঘটনায় দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অন্যতম কারণ হলো, দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল বলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশিরা দোভাষী হিসেবেও কাজ করেছেন। এসব দাবি সঠিক হলে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশি বিভিন্ন মহলে তথ্য থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে দোভাষীদের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া এবং সেই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে পৌঁছানো এক বিষয় নয়।

দূতাবাসের কাছে মামলার তথ্য পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি না, তা নির্ধারণের জন্য নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে শুধু সৌদি কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নেই অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট হবে না। দূতাবাস নিজস্ব উদ্যোগে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পেরেছিল কি না, আইনগত সহায়তার জন্য কোনো আবেদন পেয়েছিল কি না এবং মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ করেছিল কি না, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে, কোনো নাগরিকের সম্মতি, স্থানীয় আইনি বিধান এবং কনস্যুলার যোগাযোগের নিয়ম কী ছিল, তা যাচাই করাও জরুরি। কারণ, দূতাবাসের দায়িত্ব ও স্বাগতিক দেশের তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা একই বিষয় নয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরই কেন তৎপরতা?

সৌদি প্রেস এজেন্সি গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। খবরটি সামনে আসার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায়।

জেদ্দায় বাংলাদেশের মিশনের কূটনৈতিক সূত্র শুক্রবার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিল, দুই বাংলাদেশির নাগরিকত্ব ও অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের দূতাবাসের সূত্রগুলোর দাবি, আটক, বিচার এবং শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে তাদের কোনো তথ্য জানায়নি।

শনিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও জানান, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানতে পারেনি। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামো অনুযায়ী কেউ গুরুতর অন্যায় করলে আদালতের মাধ্যমে তাঁর সাজা হতে পারে। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও বলা হয়, সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনের শ্রম উইং থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশি মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সৌদি আইনে এ ধরনের কাজ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এবং আদালত সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এরপর রোববার সৌদি রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে বৈঠক করা হয়। সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এই সময়রেখা থেকে দেখা যায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তার আগে দূতাবাস কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না, সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথি যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের কঠোর বাস্তবতা

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগের বিষয়। হত্যা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশটির মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক দিনে সাতজনের শিরশ্ছেদের খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে নির্দিষ্ট কোনো মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বৈধতা, বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছিল কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করতে হয়।

সৌদি আরবে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নতুন নয়। কয়েক বছর আগে নিয়োগকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রায় ছয় বছর কারাগারে থাকার পর নরসিংদীর ছিদ্দিক মিয়ার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। পরে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসের উদ্যোগে তাঁর শাস্তি মওকুফ হয় এবং ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

ছিদ্দিক মিয়ার ঘটনা দেখায়, বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আইনি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রতিটি মামলার ঘটনা, অভিযোগ, প্রমাণ ও বিচারিক পরিস্থিতি আলাদা। ফলে আগের একটি মামলায় দূতাবাসের সফল উদ্যোগের সঙ্গে বর্তমান ঘটনাকে সরাসরি এক করে দেখা যায় না।

কনস্যুলার সুরক্ষা ও আইনি সহায়তার প্রশ্ন

বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর আইনি অধিকার রক্ষা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং আইনগত সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দূতাবাসের পক্ষে কোনো দেশের আদালতের রায় বাতিল করা বা স্থানীয় বিচারব্যবস্থার সিদ্ধান্ত সরাসরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

কূটনৈতিক মিশন সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে সময়মতো জানা এবং পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই ঘটনায় তাই দুটি পৃথক প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষ কি দুই বাংলাদেশির আটক, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানোর নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করেছে? দ্বিতীয়ত, সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ দূতাবাস নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মামলার বিষয়ে জানার সুযোগ পেয়েছিল কি না?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও প্রযোজ্য আইনি বিধান জানতে হবে। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর পেতে বাংলাদেশের মিশনের যোগাযোগের নথি, আইনি সহায়তা–সংক্রান্ত রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে হবে।

তদন্তের প্রয়োজন কোথায়?

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের বড় কূটনৈতিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার বিষয়ে কেন আগে থেকে তথ্য পাওয়া গেল না।

তবে সমালোচনা বা পাল্টা বক্তব্যের ভিত্তিতে এককভাবে কাউকে দায়ী করার আগে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানা জরুরি। সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, বিচারিক নথি, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ও তা কার্যকরের সময়রেখা, বাংলাদেশের মিশনের সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

যদি দেখা যায়, দূতাবাসের কাছে মামলার তথ্য ছিল কিন্তু যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তাহলে দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার যদি প্রমাণিত হয় যে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য জানায়নি এবং দূতাবাসের পক্ষে নিজস্ব ব্যবস্থায় তা জানার বাস্তব সুযোগও ছিল না, তাহলে বিষয়টির মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে।

একইভাবে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন কি না, তা যাচাই করা জরুরি। তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল বলে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

এই শাখার আরও খবর

রাষ্ট্রপতির মন্তব্যে হেফাজতের তীব্র প্রতিবাদ, বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ইসলামের মৌলিক তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক…

পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অংশ নিলে ঈমান থাকবে না: বায়তুল মোকাররমের খতিব

দেশে বসবাসরত অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতী আব্দুল মালেক। তবে উদারতা বা…

ঋণ করে বিদেশে পাঠানো ছেলের মৃত্যুদণ্ড, বিচার ও মরদেহ ফেরত চান বাবা

সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে নজরুলের বাবা…

৯ মাসে মব সহিংসতায় নিহত ১৮৭, ধর্ষণের শিকার ৬৫৭ নারী ও শিশু

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, সারা দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার…

অষ্টমী পূজার দিনে গ্রেপ্তার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগরওয়ালা

দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সোমবার (১৯…

নেতানিয়াহুর পাশে ট্রাম্প, ইরানে নতুন হামলার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে নেতানিয়াহুকে পুনর্নির্বাচিত করার বিষয়ে সরাসরি সমর্থন জানাতে অনীহা প্রকাশ করলেও…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au