অস্ট্রেলিয়ায় স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্য হেলেন হেইন্সকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে হামলাকারীর পরিচয় ঘিরে। ৬৫ বছর বয়সী এই এমপির ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী ব্রেন্ডন নিউজান্ট, যাঁর পরিবারের সঙ্গে হেইন্সের দুই দশকেরও বেশি সময়ের বন্ধুত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত ও পারিবারিক বন্ধুর বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ হামলার অভিযোগ ওঠায় বিস্মিত তাঁর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশও এখন খতিয়ে দেখছে, কী কারণে ব্রেন্ডন এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন।
সোমবার অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের ওয়াঙ্গারাট্টায় নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্রেন্ডন একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি নিয়ে হেলেন হেইন্সের ওপর একাধিকবার আঘাত করেন। এতে গুরুতর আহত হন এমপি। তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। মেলবোর্নের আলফ্রেড হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁর অন্য পা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
ব্রেন্ডনের বাবা রড নিউজান্ট জানিয়েছেন, তাঁদের পরিবার প্রায় ২০ বছর ধরে হেলেন হেইন্সের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে যুক্ত। ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তিনি ‘ভয়াবহ অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে তদন্তে পুলিশকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, কয়েক মাস ধরে ব্রেন্ডনের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছিল।
তবে দীর্ঘদিনের পরিচয় ও হেইন্সের প্রতি ব্রেন্ডনের আগের সমর্থনের কারণে হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার গোয়েন্দারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন বলে জানা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, হামলার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
হামলাকারীও ছিলেন পরিবেশকর্মী, সমর্থন করতেন হেলেনকে
পুলিশের শনাক্ত করা তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ডন নিউজান্ট একজন পরিবেশকর্মী। তিনি মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবেশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে তাঁকে সরব থাকতে দেখা গেছে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হেলেন হেইন্সও পরিবেশ সুরক্ষার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে আসছিলেন তিনি। এসব বিষয়ে ব্রেন্ডনের বক্তব্যের সঙ্গে হেইন্সের অবস্থানের মিল ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগে হেইন্সের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছিলেন ব্রেন্ডন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। হেইন্সের নির্বাচনী এলাকায় কনজারভেটিভ দলের অর্থায়নে পরিচালিত একটি ‘স্বতন্ত্র-বিরোধী প্রচারণার’ সমালোচনা করেও পোস্ট করেছিলেন ব্রেন্ডন। ওই পোস্টে তিনি হেইন্সকে ট্যাগ করেছিলেন।
এ কারণে হামলার অভিযোগটি আরও বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে। যাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের প্রতি ব্রেন্ডন আগে সমর্থন দেখিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তির ওপরই কেন এমন হামলা চালানোর অভিযোগ উঠল, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশ করতেন ব্রেন্ডন
ব্রেন্ডন অনলাইনে রাজনৈতিক বিষয়ে নিয়মিত মতামত প্রকাশ করতেন। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তাঁর বিভিন্ন পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।
২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানানোর পর সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করেছিলেন তিনি। এক পোস্টে ব্রেন্ডন অভিযোগ করেছিলেন, রাফায় নিরীহ মানুষের ওপর ইসরায়েলের বোমা হামলা অব্যাহত থাকার পেছনে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক সমর্থন ও সামরিক সহায়তা ভূমিকা রাখছে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংয়ের সমালোচনা করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন ব্রেন্ডন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলকে দায়মুক্তি দেওয়ার ফলে হাজারো শিশুর মৃত্যু ঘটেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব বক্তব্যের সঙ্গে হেলেন হেইন্সের ওপর হামলার কোনো সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। পুলিশও এখন পর্যন্ত হামলার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যের কথা জানায়নি।
হেলেন হেইন্সের রাজনৈতিক অবস্থান
হেলেন হেইন্স অস্ট্রেলিয়ার ইন্ডি আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ধাত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ সুরক্ষা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০১৯ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পরিবেশ রক্ষায় জোরালো ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধনকারী কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখে অস্ট্রেলিয়ার সংরক্ষণ আইন সংস্কারের প্রস্তাবেও সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন হেইন্স। তাঁর এসব অবস্থানের সঙ্গে ব্রেন্ডনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মতামতের মিল থাকলেও, এই মিল হামলার কারণ সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা দেয় না।
পরিবারের ভাষ্য: কয়েক মাস ধরে আচরণে পরিবর্তন
ব্রেন্ডনের বাবা রড নিউজান্ট এক বিবৃতিতে বলেন, হেলেন হেইন্স তাঁদের স্থানীয় সমাজের একজন সম্মানিত, মূল্যবান ও প্রিয় সদস্য। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি তাঁদের পরিবারের বন্ধু।
বিবৃতিতে রড বলেন, হেইন্সের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক এবং কল্পনার অতীত। তিনি হেইন্স, তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং পুলিশকে তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
রডের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে ব্রেন্ডনের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছিল। এদিকে ব্রেন্ডন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় ভোগা এবং আর্থিক সংকটে থাকার কথাও লিখেছিলেন বলে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্রেন্ডনের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা ছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন হতে পারে। তবে তাঁর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যার সঙ্গে হামলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছায়নি পুলিশ।
যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটে
সোমবার হেলেন হেইন্স নিজের নির্বাচনী এলাকায় একটি কুকুরের পার্ক উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। পরে ওয়াঙ্গারাট্টায় তাঁর নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে নিজের গাড়ির পেছন থেকে জিনিসপত্র নামানোর সময় একটি সাদা রঙের টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার তাঁর দিকে এগিয়ে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িটি ওয়াঙ্গারাট্টার পূর্বদিকে অবস্থিত টারাউইনগি এলাকার প্রধান সড়কে ইউটার্ন নেওয়ার পর কার পার্কে ঢোকে। এরপর গাড়িটি হেইন্সকে ধাক্কা দেয় এবং পেছনের দিকে চালিয়ে আবারও তাঁকে আঘাত করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে জানিয়েছেন, তিনি গাড়িটিকে হেইন্সকে কয়েকবার ধাক্কা দিতে দেখেছেন।
হামলায় হেইন্সের পা এতটাই গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে চিকিৎসকদের তা কেটে ফেলতে হয়েছে। তাঁর অন্য পা বাঁচাতে মেলবোর্নের আলফ্রেড হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। প্রথমে তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে মেলবোর্নে স্থানান্তর করা হয়।
ছুরি ছিল সন্দেহভাজনের কাছে, আটক করেন স্থানীয় বাসিন্দারা
হামলার পর ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন পথচারী হেলেন হেইন্সকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্রেন্ডনের কাছে একটি ছুরি ছিল। তাঁকে এলোমেলো কথাবার্তা বলতেও দেখা যায়।
রিকি জেফরিস নামের এক সেলুনকর্মী গাড়িটির দিকে ছুটে যান। তিনি ব্রেন্ডনকে গাড়ি থেকে টেনে বের করেন এবং পুলিশ না আসা পর্যন্ত তাঁকে ধরে রাখেন। একটি দোকানের কর্মী কোডি লাপোইদেভিনও তাঁকে সাহায্য করেন।
জেফরিস জানান, ব্রেন্ডনের কাছে ছুরি ছিল। তবে তিনি সেটি বের করেননি। সন্দেহভাজনের আচরণ দেখে নিরাপদ বোধ না করায় জেফরিস তাঁর পকেট থেকে ছুরিটি বের করে দূরে ছুড়ে ফেলেন বলে জানান।
এদিকে অন্য পথচারীরা হেইন্সের আহত পায়ে সাময়িক ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন এবং জরুরি সহায়তার জন্য পুলিশকে খবর দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে ব্রেন্ডনকে আটক করে।
হামলার উদ্দেশ্য এখনো অজানা
হেলেন হেইন্সের ওপর হামলার অভিযোগে ব্রেন্ডন নিউজান্টকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সাম্প্রতিক আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য এবং হামলার আগের ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখছে।
দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধুত্ব, হেইন্সের প্রতি ব্রেন্ডনের আগের সমর্থন এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর আচরণে পরিবর্তনের বিষয়ে পরিবারের বক্তব্য তদন্তকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এসব তথ্যের কোনোটিই এখন পর্যন্ত হামলার নির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করে না।
পুলিশের তদন্তে হামলার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো বিষয় কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে। আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেন একজন দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠল, তার নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ