অর্থনীতি সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন জিম চ্যালমার্স। ছবি: নিউজওয়্যার/মার্টিন অলম্যান
দীর্ঘমেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ঋণের বোঝা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে দেশটির ট্রেজারি। জাতীয় প্রতিবন্ধী বীমা কর্মসূচি (NDIS)-তে কাঠামোগত সংস্কার এবং টানা বাজেট উদ্বৃত্তের ফলে আগামী চার দশকে এই পরিবর্তন আসবে বলে আসন্ন ইন্টারজেনারেশনাল রিপোর্টে (IGR) উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম news.com.au-এর হাতে আসা প্রতিবেদনের অংশবিশেষে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির মোট ঋণ জিডিপির ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ২২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ২০৬২-৬৩ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় মোট ঋণের অনুপাত তিন বছর আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রেজারির এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে অন্যান্য বড় উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকবে।
‘অনেক অগ্রগতি হয়েছে’: চ্যালমার্স
অস্ট্রেলিয়ার ট্রেজারার জিম চ্যালমার্স বলেন, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার কৌশল ইতিবাচক ফল দিচ্ছে এবং সর্বশেষ পূর্বাভাসে তার প্রতিফলন দেখা যাবে।
তিনি বলেন, গত ইন্টারজেনারেশনাল রিপোর্টের পর বাজেট পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। সরকারের দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণেই এই অগ্রগতি হয়েছে।
চ্যালমার্স বলেন, অস্ট্রেলিয়া অনেকটা এগিয়েছে, তবে সামনে আরও কাজ বাকি। জনসংখ্যার বয়স বাড়ার কারণে বাজেটের ওপর চাপও বাড়ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কদের সেবা, প্রতিরক্ষা ও আবাসন খাতে ব্যয় বাড়ার চাপ তৈরি হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, বাজেটের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় মেডিকেয়ার, বয়স্কদের সেবা, আবাসন এবং কর কমানোর মতো খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আগের বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগগুলোর তুলনায় এবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। কর বাড়ানোর ওপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম।
ট্রেজারির মডেল অনুযায়ী, কর আদায় জিডিপির ২৪ দশমিক ২ শতাংশের ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ সীমার নিচেই থাকবে।
ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে NDIS-এর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। এই কর্মসূচির ব্যয় কমানোর ফলে ২০৬২ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার সাশ্রয় হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সামনে বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও করদাতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমতে পারে। একই সময়ে স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও বয়স্কদের সেবায় সরকারের ব্যয় বাড়বে।
বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণ বৃদ্ধির প্রভাবও অস্ট্রেলিয়ার ওপর পড়তে পারে। সুদের হার বাড়লে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ঋণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পর সরকারের ব্যয় নীতির সমালোচনা করেছে বিরোধী দল।
বিরোধী দলের অর্থনীতি বিষয়ক মুখপাত্র টিম উইলসন বলেন, সরকার অতিরিক্ত ব্যয়ে আসক্ত এবং বর্তমান ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর করের চাপ বাড়াবে।
তিনি বলেন, আজকের ঋণ আগামী দিনের করের বোঝায় পরিণত হবে। তাই ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, যাতে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে না থাকে।
২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে অস্ট্রেলিয়ার লেবার সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থায় চাপ এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন ছায়া ট্রেজারার টিম উইলসন। ছবি: নিউজওয়্যার/মার্টিন অলম্যান
আলবানিজ সরকার শুরুতে টানা দুই বছর বাজেট উদ্বৃত্ত অর্জন করলেও পরবর্তী দুই বাজেটে আবার ঘাটতিতে ফিরে যায়। ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাজেট ঘাটতি থাকার পূর্বাভাসও রয়েছে।
তবে সরকার বলছে, বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানো ও অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয় করা হয়েছে।
চ্যালমার্সের এক মুখপাত্র বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে জাতীয় ঋণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে আগের সরকার ক্ষমতায় থাকলে এই ঋণ আরও আগেই ওই সীমা ছাড়িয়ে যেত এবং চলতি বছরে তা প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারত।
মুখপাত্রের দাবি, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে ঋণ কমেছে এবং অস্ট্রেলিয়া ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সুদ পরিশোধ এড়াতে পেরেছে।
উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ঋণের বোঝা তুলনামূলকভাবে কম। জি৭ভুক্ত দেশগুলোর তুলনাতেও দেশটির ঋণের হার কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণের সুদ নিয়ে উদ্বেগ
ডিকিন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ ম্যাথিউ ক্রকার বলেন, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ এখন নিঃসন্দেহে অনেক বড় হয়ে উঠেছে।
তবে তিনি মনে করেন, সরকারি ঋণকে ব্যক্তিগত পরিবারের ঋণের সঙ্গে একভাবে দেখা ঠিক নয়। কারণ একটি ফেডারেল সরকার বাস্তবে কোনো পরিবারের মতো অর্থের সম্পূর্ণ সংকটে পড়ে যেতে পারে না।
অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (RBA) ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সরকারি বন্ড কেনার সময় অর্থ সরবরাহ বাড়াতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে, সরকারের ঋণ পরিশোধে প্রয়োজনীয় অর্থ তৈরির সক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে।
তবে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার পরিমাণের তুলনায় অর্থের প্রবাহ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে দাম বাড়তে পারে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ক্রকারের মতে, ঋণের আকার ও সুদ পরিশোধের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। ঋণের সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হওয়া মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: নিউজ.কম.এইউ