রেকর্ড ভাঙতে পারে ইউরোপের দাবানল, ফ্রান্স-স্পেনে ভয়াবহ পরিস্থিতি
মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: ইউরোপজুড়ে চলতি বছরের দাবানল অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চলতি মৌসুমের…
মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: একটি জাতি টিকে থাকে তার মাটি, নদী আর মানুষের শেকড়ে। বাংলাদেশের বয়স মাত্র ৫৫ বছর। কিন্তু এই ভূমি আর মানুষের ইতিহাস হাজার বছরের।
পলি দিয়ে গড়া এই দেশ। নদী দিয়ে বাঁধা এই জাতি। ঐতিহ্য দিয়ে বেঁচে থাকা এই মানুষ।
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার পলি জমে জমে তৈরি হয়েছে এই ভূমি।
উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। মাঝখানে বিস্তীর্ণ সমভূমি। দেশের ৮০% এলাকাই সমতল। এই সমভূমিই আমাদের কৃষির প্রাণ।
একদিকে সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ। বাঘ, হরিণ, গাছের রাজ্য। অন্যদিকে চট্টগ্রামের পাহাড়। খাগড়াছড়ি-বান্দরবান-রাঙামাটির সবুজ উপত্যকা।
সিলেটের হাওর, উত্তরের চা বাগান, মধ্যের চরাঞ্চল। এক দেশে এত বৈচিত্র্য পৃথিবীতে বিরল।
কিন্তু এই ভূপ্রকৃতি আজ হুমকিতে। সমুদ্রের পানি বাড়ছে। নদী ভাঙছে। লবণাক্ততা ঢুকছে জমিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার আমরাই।
বাংলাদেশে ৭০০ এর বেশি নদী। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, কর্ণফুলী, সুরমা।
হাজার বছর ধরে এই নদী দিয়েই মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, কৃষি। নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে নগর-বন্দর। নদীর পানিতেই ফলেছে ফসল। নদীর মাছেই পুষ্টি পেয়েছে মানুষ।
“নদী মাতৃক” শব্দটা আমাদের রক্তে। নদী ছাড়া বাঙালির গান হয় না। “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” – এই গানের প্রতিটা লাইনে নদী আছে।
কিন্তু গত ৩০ বছরে ২০০+ নদী মরে গেছে। দখল, দূষণ, বাঁধ। তিস্তায় পানি নাই। বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা মৃতপ্রায়।
নদী বাঁচানো মানে সভ্যতা বাঁচানো। নদী খনন, দখলমুক্ত করা, আন্তর্জাতিক চুক্তি – এগুলো এখন সময়ের দাবি।
এই দেশের মাটি পলি মাটি। প্রতি বছর বন্যার পানি নতুন পলি দিয়ে যায়। তাই জমি কখনো অউর্বর হয় না।
একই জমিতে বছরে ৩ বার ফসল। ধান, পাট, গম, সবজি, ফল।
একসময় এই পাটের জন্যই “সোনালী আঁশের দেশ” নাম হয়েছিল। এই মাটিতেই ইলিশ ডিম ছাড়ে, আম-কাঁঠাল-লিচু হয়।
কিন্তু মাটিও আজ অসুস্থ। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক, শিল্পবর্জ্য। ফলন কমছে। খরচ বাড়ছে।
কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে মরে। তরুণরা মাটি ছেড়ে শহরে যায়। মাটির সাথে মানুষের হাজার বছরের সম্পর্ক ছিঁড়ে যাচ্ছে।
১৭ কোটি মানুষ। এক ভাষা। এক সংস্কৃতি।
বাঙালি মানে বন্যায় ঘর ভাসলেও পরদিন আবার ঘর তোলা। ঘূর্ণিঝড়ে স্বজন হারালেও আবার জাল নিয়ে নদীতে নামা।
বাঙালি মানে অতিথিপরায়ণ। ঈদ-পূজা-বৈশাখ সবার। মসজিদের আজান আর মন্দিরের ঘণ্টা একসাথে।
এই মানুষই ১৯৫২ তে মায়ের ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছে। ১৯৭১ এ ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেছে।
কিন্তু আজ এই মানুষই দিশেহারা। কাজ নাই। নিরাপত্তা নাই। মেধার দাম নাই। তাই ২০ লক্ষ তরুণ দেশ ছেড়েছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্য হাজার বছরের।
পাল-সেন যুগের স্থাপত্য। সুলতানি-মোঘল আমলের মসজিদ।
নকশী কাঁথা। জামদানি। মসলিন।
লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন।
পহেলা বৈশাখ। নৌকা বাইচ। পিঠা-পুলি।
পাহাড়ে ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, উৎসব। এটাও বাংলাদেশের গর্ব।
কিন্তু আজ এই ঐতিহ্য মুছে ফেলার চক্রান্ত। পাঠ্যবই থেকে ইতিহাস বাদ। শিল্পী-সাহিত্যিককে মবের হুমকি। সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা।
শেকড়বিহীন গাছ যেমন বাঁচে না, ঐতিহ্যবিহীন জাতিও বাঁচে না।
হাজার বছরের এই বন্ধন রক্ষা করতে এখনই ৪টি কাজ জরুরি:
নদী খনন, দখলমুক্ত, বনায়ন। সুন্দরবন-হাওর-পাহাড় বাঁচানো।
জৈব কৃষি, কৃষককে ভর্তুকি, তরুণদের কৃষিতে আনা।
কাজ, শিক্ষা, আইনের শাসন। যাতে মেধা দেশেই থাকে।
স্কুলে ইতিহাস, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
বাংলাদেশ শুধু ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ড না।
বাংলাদেশ হলো হাজার বছরের মাটি আর মানুষের গল্প।
এই মাটি আমাদের মা। এই নদী আমাদের প্রাণ। এই মানুষ আমাদের শক্তি। এই ঐতিহ্য আমাদের পরিচয়।
এগুলো হারালে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাবো।
আসুন, আমরা আমাদের শেকড় আঁকড়ে ধরি। নইলে ইতিহাস একদিন জিজ্ঞেস করবে – “হাজার বছরের মাটি ও মানুষকে তোমরা কী দিলে?”
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au