সর্বশেষ

গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য

লেখক:------ মানিক লাল ঘোষ-----

  • 8:44 pm - July 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৬ বার
গুরু পূর্ণিমা: ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাহাত্ম্য।ফাইল ছবি

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: ​আষাঢ়ী পূর্ণিমা, পবিত্র গুরু পূর্ণিমা—ভারতীয় উপমহাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে আধ্যাত্মিক ও শৈক্ষিক গুরুদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর এক মহিমান্বিত দিন। সনাতন ধর্মে আষাঢ় মাসের এই পূর্ণিমা তিথি অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয়, কারণ এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন মহাভারতের রচয়িতা ও বেদব্যাস—যাকে মানবজাতির আদি গুরু বা ‘বেদব্যাস’ হিসেবে পূজা করা হয়।

​’গুরু’ শব্দটির গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ রয়েছে। ‘গু’ অর্থ অন্ধকার এবং ‘রু’ অর্থ আলো বা নিবারণকারী। অর্থাৎ, যিনি আমাদের জীবনের অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করেন, তিনিই গুরু। গুরু শুধু বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষক নন; জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যিনি সঠিক পথ দেখান, নৈতিকতার পাঠ দেন এবং আত্মোপলব্ধিতে সাহায্য করেন—তিনিই গুরুর আসনে বৃত। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সংস্কৃতিতে গুরু-শিষ্য পরম্পরার এক অনন্য স্থান ছিল। গুরুগৃহে থেকে শিক্ষার্থীরা শুধু শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করত না, বরং জীবনবোধ, শৃঙ্খলা ও আত্মসংযমের শিক্ষা লাভ করত।

​গুরু পূর্ণিমার ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক শিকড় প্রোথিত রয়েছে সুদূর প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য ও সনাতন সংস্কৃতির গভীরে। এই বিশেষ তিথিটির ইতিহাস মূলত আধ্যাত্মিক সাধনা, জ্ঞানচর্চা এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরার বিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আষাঢ় মাসের এই পূর্ণিমা তিথিতেই জন্ম নেওয়া মহান ঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস মানবজাতিকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে বেদকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন এবং পুরাণ ও মহাভারত রচনা করেছিলেন। তাঁকে সনাতন ধর্মের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু বা আদি গুরু হিসেবে গণ্য করা হয় বলে এই দিনটি ঐতিহাসিকভাবে ‘ব্যাস পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত। প্রাচীনকাল থেকেই সাধক, ঋষি এবং শিক্ষার্থীরা এই দিনে বেদব্যাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছেন।

​ঐতিহাসিকভাবে গুরু পূর্ণিমা কেবল একজন ব্যক্তিকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং এটি সমগ্র গুরু-শিষ্য পরম্পরা উদযাপনের দিন। প্রাচীন বৈদিক ও উপনিষদীয় যুগে শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের গুরুগৃহে বসবাস করতে হতো। বছরজুড়ে কঠোর শৃঙ্খলা, সেবা এবং সাধনার পর আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনে শিক্ষার্থীরা তাদের গুরুর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত এবং গুরুর কাছ থেকে নতুন জ্ঞান বা দীক্ষা গ্রহণ করত। সেই সময় থেকেই এই দিনটি শিক্ষকদের প্রতি সম্মান জানানোর বাৎসরিক আচার হিসেবে রূপ লাভ করে। এ ছাড়া পৌরাণিক বিবরণ অনুযায়ী, গুরু পূর্ণিমার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবাদিদেব মহাদেবের ইতিহাসও। সনাতন ধর্মে শিবকে আদি গুরু হিসেবে মানা হয়, যিনি এই আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনটিতেই তাঁর প্রথম সপ্তর্ষি বা শিষ্যদের যোগ সাধনা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানদান শুরু করেছিলেন। পাশাপাশি, বৌদ্ধ ধর্মেও এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে; বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বুদ্ধত্ব লাভের পর আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনেই গৌতম বুদ্ধ সারনাথে তাঁর প্রথম শিষ্যের কাছে প্রথম ধর্মোপদেশ প্রদান করেছিলেন।

​সময়ের পরিবর্তনে গুরু ও শিষ্যের সম্পর্কে কিছু যান্ত্রিকতা এসেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পরিধি অনেক প্রসারিত হয়েছে বটে, কিন্তু এর মূল আত্মা আজও অপরিবর্তিত। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে সঠিক মানসিক দিকনির্দেশনা এবং নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে গুরু বা শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। শুধু পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা মুখস্থ করানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মনে কৌতূহল ও সৃজনশীলতা তৈরি করাই একজন আদর্শ গুরুর প্রধান কাজ। একজন প্রকৃত শিক্ষক বা অভিভাবক শুধুমাত্র তথ্য সরবরাহ করেন না, বরং তরুণ প্রজন্মের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে তাদের একজন মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।

​গুরু পূর্ণিমা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ঋদ্ধ ঐতিহ্যকে, যেখানে শিক্ষাকে দেখা হতো জীবনের মুক্তি ও কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে। হাজার হাজার বছরের সেই অবিনশ্বর সংস্কৃতির ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানবসভ্যতায় জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। আজকের এই দিনে আমাদের প্রত্যেকের উচিত জীবনের সেই সমস্ত শিক্ষক, মেন্টর এবং পথপ্রদর্শকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো, যারা কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। গুরু পূর্ণিমা কেবল একটি আচার-অনুষ্ঠানের দিন নয়; এটি শিক্ষক এবং শিক্ষার প্রতি আমাদের অন্তরের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক পবিত্র উপলক্ষ, যার গুরুভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর জীবনে প্রকৃত জ্ঞানের আলো প্রবেশ করে।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।  বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং  বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক)

এই শাখার আরও খবর

গুলশান থেকে গ্রেপ্তার সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি)…

পুলিশের বাধায় হবিগঞ্জ যেতে পারেননি এনসিপি নেতারা

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই:হবিগঞ্জে পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর। পরে হবিগঞ্জ সীমান্তেও…

ইরানকে ফের কঠোর হামলার হুমকি ট্রাম্পের

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের…

২০৩৬ সালে টাকার মূল্য থাকবে না? এআই নিয়ে ইলন মাস্কের বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণী

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক দাবি করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটের অগ্রগতির ফলে প্রচলিত অর্থব্যবস্থার…

‘দ্য ওডিসি’তে কে কত পারিশ্রমিক নিয়েছেন

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’ বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। গ্রিক মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তির পর…

আত্মহত্যার আগের দিন থানায় গিয়েছিলেন মা, সমুদ্রে মিলল মা-মেয়ের মরদেহ

মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যার সন্দেহে থাকা এক মা ঘটনার আগের দিনই স্থানীয় থানায় গিয়েছিলেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au