পাঁচ বছর স্বেচ্ছাচারীভাবে আটক থাকার পর ইরাক থেকে মুক্তি পেয়েছেন অস্ট্রেলীয় বাবা রবার্ট পেথার। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আটক থাকার পর ইরাক ছেড়েছেন অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী রবার্ট পেথার। তাঁর মুক্তির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রচারণা ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর অবশেষে দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ইরাক থেকে আয়ারল্যান্ডে গিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে পুনর্মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
৫১ বছর বয়সী পেথার ও তাঁর মিসরীয় সহকর্মী খালেদ জাগলুলকে ২০২১ সালের এপ্রিলে বাগদাদ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের এক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে কাজ করছিলেন।
সোমবার অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তারা পেথারকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে তাঁর আয়ারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল।
পেথারের ২৩ বছর বয়সী ছেলে ফ্লিন জানিয়েছেন, তাঁর বয়স যখন ১৭ বছর, তখন বাবাকে শেষবার দেখেছিলেন তিনি। ডাবলিনে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যরা পেথার বিমানে ওঠার আগপর্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন।
ফ্লিন বলেন, ‘আমরা প্রথমে বলেছিলাম, বিমান আকাশে না ওড়া পর্যন্ত আনন্দ করব না। এখন তিনি ইরাকের আকাশসীমা পেরিয়ে ডাবলিনের পথে রয়েছেন।’
বাবার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, পেথার একই সঙ্গে স্বস্তি ও আবেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরতে পেরে তিনি আনন্দিত। তবে এত দীর্ঘ সময় আটক থাকার অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর মধ্যে মানসিক আঘাতের প্রভাবও থাকতে পারে।
‘ভয়াবহ অবিচারের শিকার হয়েছেন বাবা’
ফ্লিনের অভিযোগ, তাঁর বাবা ভয়াবহ অবিচারের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে পেথারকে নির্দোষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে সাড়ে পাঁচ বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে।
ফ্লিন বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ অন্যায়। এমন ঘটনা চলতে দেওয়া উচিত নয়। গত সাড়ে পাঁচ বছরে আমাদের কাছ থেকে যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করে নতুনভাবে জীবন গড়ার অপেক্ষায় আছি আমরা।’
বাবার মুক্তির অংশ হিসেবে ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের জরিমানাও বাতিল করা হয়েছে বলে জানান ফ্লিন। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী না হয়েও একজন সাধারণ কর্মীর ওপর এত বড় অঙ্কের দায় চাপানো যুক্তিসংগত নয়।
বাবার মুক্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালানো মা দেশরির অবদানের কথাও তুলে ধরেন ফ্লিন। পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সরকার এবং জিম্মি ও আটক ব্যক্তিদের সহায়তাকারী সংস্থা হোস্টেজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
২০২১ সালে দোষী সাব্যস্ত, ২০২৫ সালে জামিন
২০২১ সালের আগস্টে ইরাকের এক আদালত পেথারকে প্রতারণার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। তবে তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, তিনি যে প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান সিএমই কনসাল্টিংয়ে কাজ করতেন, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের দায় তাঁর ওপর চাপানো উচিত নয়।
২০২৫ সালের জুনে জামিনে মুক্তি পেলেও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তাঁকে ইরাকেই থাকতে হয়। এরপর থেকে তাঁর স্ত্রী দেশরি পেথারের মুক্তির দাবিতে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, পেথারকে আটকে রাখার ঘটনা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি এবং এটি ছিল স্বেচ্ছাচারী আটক।
কারাগারে থাকার সময় পেথারের স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটে। তাঁর ওজন অনেক কমে যায় এবং তিনি ক্যানসারের সঙ্গেও লড়াই করেছেন।
২৮০ বার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে অস্ট্রেলিয়া

রবার্ট পেথার (ডানে) আয়ারল্যান্ডে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে রওনা হয়েছেন। ছবি: পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ, অস্ট্রেলিয়া
পেথারের মুক্তিতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং। তিনি বলেন, ইরাক সরকার পেথারকে দেশ ছাড়ার অনুমতি দেওয়ায় অস্ট্রেলিয়া সরকার স্বাগত জানিয়েছে।
ওং জানান, সোমবার সকালে তিনি পেথারের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সময় তাঁর মুক্তিতে স্বস্তি প্রকাশের পাশাপাশি দ্রুত সুস্থতা এবং পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য শুভকামনা জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পেথার আটক হওয়ার পর থেকে অস্ট্রেলিয়া সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ২৮০ বার তাঁর মুক্তির বিষয়ে ইরাকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করেছে।
ইরাক সরকার পেথার অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে ওং বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে আর্থিক জরিমানা পরিশোধে অস্ট্রেলিয়া সরকার অর্থ দেবে না। বরং এ ধরনের ঘটনায় ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোই সরকারের নীতি।
দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর পেথারের ইরাক ছাড়ার মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
সূত্র: নাইন.কম.এইউ