চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন পিছিয়ে আগামী ৫ নভেম্বর ধার্য করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন নির্ধারিত ছিল। তবে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।
মামলাটিতে এরই মধ্যে আসামিদের একজন ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মজিবুর রহমান ডনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। ২৭ আগস্ট রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ৯ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম গত বছরের ২০ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক ব্যক্তিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেছেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের নিজ ফ্ল্যাটে মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। মৃত্যুর সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। তবে পরে তিনি দাবি করেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। এ অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অপমৃত্যুর মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি। এরপর মামলার অভিযোগ তদন্তের জন্য আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
সালমান শাহর বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। একই সঙ্গে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, তারা তার ছেলের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানালে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার নির্দেশ দেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি এবং জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করেও সালমান শাহকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এবং স্ত্রী সামীরা হকের কারণে মা নীলা চৌধুরী থেকে আলাদা থাকার মানসিক কষ্ট থেকে সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
তবে পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তিনি আরও তদন্তের দাবি জানান। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
এরপর সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন আদালত ওই রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় ধরে এর শুনানি হয়নি।
পরবর্তীতে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তার মায়ের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রমনা মডেল থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। এরপর নতুন করে মামলার তদন্ত শুরু হয়। বর্তমানে সিআইডির তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিলের অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
আদালতের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ৫ নভেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবেন কি না, তার ওপরই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ভর করছে।