বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন ১২ আগস্ট ২০২৫- ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে কিছু পরিবর্তনের আভাস মিলছে, তবে বাস্তবে ইসরায়েলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এগুলো এখনও অনেকটাই অপ্রতুল। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ইসরায়েল অসন্তুষ্ট হলেও এটি তাদের জন্য বড় কোনও কূটনৈতিক ধাক্কা নয়—বরং বিরক্তিকর এক পরিস্থিতি মাত্র। কিন্তু যেটি ইসরায়েল সত্যিই ভয় পায়, তা হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।
জেরুজালেমে ছয় বছরের অভিজ্ঞতায় শত শত রাজনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা ও সাধারণ ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বলে জন লায়ন্স বুঝেছেন—তাদের কাছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধ করাই প্রধান কৌশল। এজন্য অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশে ইসরায়েলি লবিগুলো প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে সমালোচনা কমানো এবং রাজনীতিক ও গণমাধ্যমকে বোঝানো হয়—ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ভুল হবে।
চরম ডানপন্থী নেতৃত্বের উত্থান
অস্ট্রেলিয়া–ইসরায়েল জিউইশ অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (AIJAC) সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার আলবেনিজ সরকার ইসরায়েলের দুই প্রভাবশালী চরম ডানপন্থী মন্ত্রী—ইতামার বেন–গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। AIJAC বলেছে, এটি দুই “গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কিন্তু বিতর্কিত” মন্ত্রীর ওপর বড় ধরনের অবনতি সূচক পদক্ষেপ। তবে AIJAC এড়িয়ে গেছে যে ইসরায়েলি রাজনীতি আজ অনেক বেশি ডানদিকে সরে গেছে।
মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে “গাজা ধ্বংস” বা ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করার মতো মন্তব্য করেছেন। ২০২১ সালে স্মোটরিচ ইসরায়েলি সংসদের আরব সদস্যদের বলেছিলেন—”তোমরা এখানে ভুলবশত আছ, ১৯৪৮ সালে বেন–গুরিয়ন তোমাদের বের করে দেননি, সেটাই ভুল।” আজ সেই মানসিকতার নেতারাই প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা।
গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়
ইউনিসেফের হিসাবে, যুদ্ধের প্রথম ২১ মাসে ইসরায়েল ১৭,০০০ শিশু হত্যা করেছে এবং ৩৩,০০০ শিশুকে আহত করেছে—গড়ে প্রতিদিন একটি শ্রেণিকক্ষের সমান শিশু নিহত হচ্ছে। আগস্টে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮,৫০০–তে। ওয়াশিংটন পোস্ট নিহত প্রতিটি শিশুর নাম প্রকাশ করেছে—যা এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
এত শিশু হত্যার পরও ইসরায়েল বহু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে—যা অন্য কোনও দেশের পক্ষে সম্ভব হতো না। তবে ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি বিশ্বজনমত বদলে দিয়েছে। খাদ্য, পানি ও ওষুধ সরবরাহে ইসরায়েলের কড়াকড়ি আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করছে।
দুই রাষ্ট্র সমাধানের জটিলতা
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে ইসরায়েলের কাছে এর সময় কখনও সঠিক নয়। ২০০৯ সালে জন লায়ন্স ইসরায়েলে গিয়ে দেখেছেন, ইসরায়েলি রাজনীতিকরা তখন বলেছিল—ফাতাহ ও হামাস বিভক্ত, তাই শান্তি আলোচনা সম্ভব নয়। পরে ফিলিস্তিনিরা ঐক্য সরকার গঠন করলে ইসরায়েল আবার অজুহাত খুঁজে নেয়। প্রতিটি পর্যায়ে শান্তি প্রক্রিয়া এগোয়নি।
গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা
৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ১৮৬ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি আল জাজিরার সাংবাদিক আনাস আল–শরীফকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলায় আরও কয়েকজন নিহত হন, যা আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র নিন্দা কুড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা
ইসরায়েল বুঝে গেছে—যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সমর্থন দিচ্ছে, ততক্ষণ তারা অজনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারবে। তবে ইতিহাস বলছে, যেমনটা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য শেষ হয়েছিল, তেমনি আর্থিক চাপই ইসরায়েলকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারে। বর্তমানে পশ্চিম তীরে অনেক ইহুদি বসতি স্থাপনকারী প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী।
অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী আলবেনিজ বিশ্বাস করেন—দুই রাষ্ট্র সমাধানই হামাসকে একঘরে করার পথ। তবে নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা শেষ করা—আজ গাজার ধ্বংসস্তূপে প্রতিফলিত।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব বিশ্ব একযোগে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে গাজা পুনর্গঠন ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পথে কিছুটা অগ্রগতি সম্ভব। অন্যথায়, গাজার ধ্বংস ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন একইসঙ্গে কবরস্থ হবে।
“অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ যখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, ইসরায়েলি সরকার এতে অসন্তুষ্ট হলেও এটি বড় ধরনের ধাক্কার চেয়ে বেশি বিরক্তিকর একটি ঘটনা মাত্র।” — লেখক: জন লায়ন্স