‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয়’, মৃত্যুদণ্ডের আগে নজরুলের সেই আক্ষেপ
পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নজরুল ইসলাম মাহিন। কিন্তু পরিবারের দুশ্চিন্তা দূর করার স্বপ্ন নিয়ে…
মেলবোর্ন, ৭ সেপ্টেম্বর- রাজবাড়ী ও রাজশাহীর দুটি মাজারে হামলার ঘটনার পর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ। শুক্রবার বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ‘নুরাল পাগলার মাজারে’ এবং রাজশাহীর পবা উপজেলার একটি খানকা শরিফে হামলা চালায় হাজারো মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেই ঘটে এই নৃশংস ভাঙচুর। ফলে আবারও প্রশ্ন উঠেছে সরকারের ভূমিকাকে ঘিরে—‘মব সন্ত্রাস’ রোধে কতটা কার্যকর হচ্ছে প্রশাসন?
শনিবার সকাল থেকেই গোয়ালন্দের মাজার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ভ্রাম্যমাণ টহল দলও মোতায়েন রয়েছে। মাজারের গেট বন্ধ রাখা হলেও আশপাশের মানুষ ভিড় করছেন ক্ষতিগ্রস্ত স্থানটি দেখতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুক্রবার হাজার হাজার মানুষ হামলা চালিয়েছে মাজারে। তারা শঙ্কায় আছেন—আবারও এ ধরনের হামলা হতে পারে।
এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাঁধা ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে অজ্ঞাত সাড়ে তিন হাজার জনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ।

সমালোচনার মুখে পড়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। ছবিঃ বিবিসি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাজারটির প্রতিষ্ঠাতা নুরুল হক মৃত্যুর আগে নিজেকে ইমাম মাহাদি দাবি করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ কবরের ভেতরে উঁচু করে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়। এ নিয়েই ক্ষোভে ছিলেন স্থানীয় আলেম সমাজ।
গত মঙ্গলবার উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির সংবাদ সম্মেলনে মাজারে ‘অনৈতিক কার্যকলাপের’ অভিযোগ আনা হয়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে কবর সমতল করার দাবি জানানো হয়। না হলে শুক্রবার জুমার নামাজের পর ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচির হুমকি দেয়া হয়।
স্থানীয় প্রশাসন জানায়, বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, “পরিবার ও মাজার কর্তৃপক্ষ সময় নিয়ে কালক্ষেপণ করছিলেন, উল্টো আমরাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিলাম।”
রাজবাড়ী পুলিশের দাবি, হামলার দিন অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্য এবং দুইজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে মোতায়েন ছিলেন। সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও নামাজের পর ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশের’ নামে আকস্মিক হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে রাজশাহীর পবায় খানকা শরিফেও একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগ—আগাম তথ্য থাকলেও পুলিশ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়।
বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন,
“রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক যে উদ্দেশ্যেই হোক, মব সন্ত্রাস যদি একবার ছাড় পায়, তারা বারবারই সেই সুযোগ নেবে। এখন বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। ছোঁয়াচে রোগের মতো মব কালচার ছড়িয়ে পড়ছে।”
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, পুলিশের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা না থাকলে তারা কাজ করতে পারবে না। “অন্যায় করলে পুলিশেরও বিচার হতে হবে, তবে তাদের সঙ্গে অন্যায়ের বিচারও করতে হবে।”
গত দুই মাসেই রংপুর, গঙ্গাচড়া, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম অবমাননা বা রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে দলবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেছে। রংপুরের তারাগঞ্জে দুই ব্যক্তিকে মব পিটিয়ে হত্যা, গঙ্গাচড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ‘মঞ্চ ৭১’ অনুষ্ঠানে আলোচকদের হেনস্তা—সবখানেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ভয়, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও প্রশাসনের ‘নীরবতা’ মব সন্ত্রাসকে উসকে দিচ্ছে। ড. হক বলেন,
“মবকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ নিজেই আক্রমণের শিকার হবে কিনা—এমন ভয় তাদের কাজ করতে বাধা দিচ্ছে।”
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, “সরকারের উচিত আরও কঠোর হওয়া। তা না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হবে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন উঠবে।”
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি অভিযোগ করেছে, সরকারের নীরবতা বা পরোক্ষ সমর্থনে দেশে ‘মবোক্রেসি’ চলছে। তারা বলছে, প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোর দুর্বলতায় দেশে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।
যদিও মাজারে হামলার ঘটনায় শুক্রবার রাতেই নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেখানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au