মতামত

শুভ বিজয়া দশমী: অশুভের বিনাশ, সত্য ও মানবতার জয়

মতামত:মানিক লাল ঘোষ

  • 1:00 am - October 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৬ বার
শুভ বিজয়া দশমী: অশুভের বিনাশ, সত্য ও মানবতার জয়। ছবি: সংগৃহীত

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ অধ্যায় বিজয়া দশমী। আনন্দ, বেদনা, আবেগ ও সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধনে এই দিনটি বাঙালির হৃদয়ে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কয়েক দিনের উৎসব, পূজা-অর্চনা, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর দেবী বন্দনার পর বিদায়ের সুর বেজে ওঠে চারদিকে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, কিন্তু দেবীর আগমনী বার্তা ও তাঁর অন্তর্নিহিত শিক্ষা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে।

দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, ন্যায় ও শুভবোধের প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় কেবল একটি অসুরবধের ঘটনা নয়; এটি অন্যায়, অত্যাচার, অহংকার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক। বিজয়া দশমী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্য ও ন্যায়ের আলোকে নিভিয়ে দেওয়া যায় না। অন্যায়ের দাপট সাময়িকভাবে প্রবল হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা, বিবেক ও ন্যায়বোধের শক্তিই শেষ পর্যন্ত মানুষের পথ দেখায়।

তবে বিজয়া দশমীর তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর রয়েছে গভীর সামাজিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক আবেদন। দেবীর কাছে আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা দূর হোক। মানুষের মধ্যে গড়ে উঠুক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার বন্ধন। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষ যেন অবহেলা, নির্যাতন বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন।

বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম শক্তি তার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য। এ দেশের মাটি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত শ্রম, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগে সমৃদ্ধ। আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরবময় অধ্যায়গুলোও সাক্ষ্য দেয়, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই প্রকৃত শক্তি। তাই দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমী কেবল একটি সম্প্রদায়ের আনন্দের উপলক্ষ নয়; এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানবোধকে আরও সুদৃঢ় করারও একটি সুযোগ।

কিন্তু উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ও নির্ভয়ে তা উদ্‌যাপন করতে পারেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের সুরক্ষা এবং প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। উৎসবের সময় শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি সারা বছরই এই দায়িত্ব পালনের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু মুখের সম্প্রীতি নয়, আচরণে, সামাজিক সম্পর্কে এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডেও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

বিজয়া দশমীর আরেকটি বড় শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি। দেবীকে বিদায় জানানো মানে কেবল প্রতিমাকে বিসর্জন দেওয়া নয়; নিজের ভেতরের লোভ, ক্রোধ, অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষেরও বিসর্জন দেওয়া। আমরা যদি মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল না হই, দুর্বলের পাশে না দাঁড়াই, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করি, তবে উৎসবের বাহ্যিক আয়োজন আমাদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারবে না। সত্যিকারের বিজয়া তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষের মনে মানবতার জয় হবে এবং সমাজে ন্যায় ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা ঘটবে।

আজকের বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের নানা সংকট আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। ভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে। বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে।

দেবীর বিদায়বেলায় চোখে জল আসে, হৃদয়ে জাগে আবার ফিরে আসার প্রত্যাশা। এই বিদায় তাই বিচ্ছেদের পাশাপাশি নতুন আশারও বার্তা বহন করে। আগামী দিনগুলোতে সমাজ থেকে অন্যায় ও অমানবিকতা দূর হোক, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়ুক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হোক—এটাই হোক বিজয়া দশমীর প্রত্যাশা।

আসুন, বিজয়া দশমীতে আমরা শপথ নিই—অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধ, বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ভালোবাসা, বিভেদের বিরুদ্ধে সম্প্রীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াব। ধর্ম যার যার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা সবার—এই মানবিক চেতনাকে ধারণ করে গড়ে তুলি একটি শান্তিপূর্ণ, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ।

সবাইকে জানাই বিজয়া দশমীর আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। শুভ হোক সকলের জীবন, জয় হোক মানবতার।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহ সম্পাদক)

এই শাখার আরও খবর

সৌদি আরবে নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কূটনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ

মক্কায় মসজিদের ভেতরে চুম্বনের অভিযোগে এক বাংলাদেশি পুরুষ ও এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। তবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের রায় কিংবা তা কার্যকরের বিষয়ে সৌদি…

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে চাপে বাংলাদেশের প্রধান পোশাকশিল্প

বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ও বিদ্যুৎ ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। সকাল ১১টা। ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায়…

নিহত যুবদল নেতার মাথার খুলিতে মিলল বুলেট, সিসিটিভিতে গুলির শব্দ

মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে নিহত যুবদল নেতা শাকের হোসেনের (৩৯) মাথার খুলির ভেতর থেকে একটি বুলেট পাওয়া গেছে। আজ বুধবার…

মাগুরায় নিহত যুবদল নেতার মাথার ভেতরে মিলল গুলি

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : মাগুরা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেনের মাথা থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে মাগুরা ২৫০…

পরিবারের দাবি, ফাঁসানো হয়েছে : চুম্বনের দাবিও নিশ্চিত নয়

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় অভিযোগ, আদালতের রায় এবং বাংলাদেশকে আগে অবহিত না করার কারণ জানতে চেয়েছে…

এবার জার্মানিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক শিক্ষার্থীদের

  জার্মানিতে শিক্ষা ও সামাজিক খাতে ব্যয় সংকোচন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের পরিকল্পনার প্রতিবাদে আগামী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন শিক্ষার্থী…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au