রাজনীতিতে প্রবেশের আগে, তাকাইচি টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২২ অক্টোবর: টেলিভিশন উপস্থাপিকা থেকে হেভি মেটাল ব্যান্ডের ড্রামার, আর এখন জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী-সানায়ে তাকাইচির জীবন যেন রূপকথার মতো। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশের নতুন নেতা হিসেবে তাকাইচি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন পার্লামেন্টের অনুমোদনের পর।
১৯৬১ সালে নারা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া তাকাইচির বাবা ছিলেন চাকরিজীবী, আর মা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। রাজনীতির বাইরে বেড়ে উঠলেও, ১৯৮০-এর দশকের যুক্তরাষ্ট্র-জাপান বাণিজ্য সংঘাত তাকে রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই সময় তিনি মার্কিন কংগ্রেসওম্যান প্যাট্রিসিয়া শ্রোডারের অফিসে কাজ করে জাপান-বিরোধী মনোভাব কাছ থেকে দেখেন।
১৯৯২ সালে প্রথম নির্বাচনে পরাজিত হলেও, ১৯৯৬ সালে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-তে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে ১০ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি, মাত্র একবার হেরেছেন।
তাকাইচি বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৪ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তাকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আবের ঘনিষ্ঠ অনুসারী তাকাইচি “আবেনোমিক্স” নীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২০২১ ও ২০২৪ সালে দুইবার এলডিপির নেতৃত্বের দৌড়ে অংশ নিয়েও হেরে যান তিনি। তবে ২০২৫ সালে তৃতীয়বারের প্রচেষ্টায় অবশেষে জয়লাভ করে ইতিহাস গড়েন-জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
তাকাইচিকে এখন মোকাবিলা করতে হবে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ- অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি, নিম্ন জন্মহার ও ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে করা শুল্ক চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সম্পর্কও তার জন্য বড় পরীক্ষা।
‘জাপানের মার্গারেট থ্যাচার’ হিসেবে পরিচিত তাকাইচি একজন কট্টর রক্ষণশীল। তিনি বিবাহিত নারীদের কুমারী নাম রাখার অনুমতি ও সমকামী বিবাহের বিরোধিতা করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুর নরম করে তিনি পরিবার ও শিশু যত্নে কর-ছাড় এবং ইন-হাউস চাইল্ড কেয়ার পরিষেবা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এক সময়ের হেভি মেটাল ব্যান্ড ড্রামার তাকাইচি পরিচিত ছিলেন তার ভাঙা ড্রামস্টিকের জন্য। তিনি স্কুবা ডাইভার এবং গাড়িপ্রেমী; তার প্রিয় টয়োটা সুপ্রা এখন নারা জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।
তিনি নিয়মিত ইয়াসুকুনি মন্দির পরিদর্শন করেন, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদেরও সম্মান জানানো হয়,যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া, তিনি জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর ওপর আরোপিত সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাকাইচি বলেছেন, “আমি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চাই যেখানে কেউ সন্তান বা পরিবারের যত্নের জন্য নিজের ক্যারিয়ার ত্যাগ করতে বাধ্য হবে না।”
জাপানের রাজনীতিতে এই ‘লৌহ মানবী’র উত্থান এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে- যেখানে নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনা আরও শক্তভাবে আলোচনায় এসেছে।
সুত্রঃ বিবিসি