মেলবোর্ন, ২৮ জুন- বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের মধ্যে মান্দারিন ভাষা শেখার আগ্রহ বাড়ছে। বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের, রাজনীতিক ও রাজপরিবারের সদস্যদের সন্তানদের অনেকেই এখন চীনের সরকারি ভাষা মান্দারিন শিখছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি ভাষা শেখার বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতি, কূটনীতি ও ব্যবসায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশল।
সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীনা ভাষায় একটি পোস্ট দিয়ে জানান, “আমার ছেলে বর্তমানে মান্দারিন ভাষা শিখছে।” তার এই মন্তব্য নতুন করে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে আসে।
শুধু মাস্কের পরিবারই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকজন নাতি-নাতনি, অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সন্তান এবং মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের সন্তানরাও মান্দারিন ভাষা শিখছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম ও রাজকুমারী ক্যাথরিনের জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রিন্স জর্জও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কিছুটা মান্দারিন শিখেছিলেন বলে জানা গেছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং চীনবিষয়ক অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ফলে প্রভাবশালী পরিবারগুলোর জন্য মান্দারিন শেখা এখন বাস্তব প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
তার ভাষায়, ব্যবসা, প্রযুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যারা ভবিষ্যৎ দেখতে চান, তাদের জন্য চীনা ভাষা শেখা একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কেউ চীনের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচক হলেও ব্যবসায়িক বাস্তবতা তাকে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য করবে।
কেরি ব্রাউন বলেন, এসব প্রভাবশালী ব্যক্তির অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাতনি আরাবেলা কুশনার মান্দারিন ভাষায় একটি গান পরিবেশন করেছিলেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তার মতে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্প্রতি বেইজিং সফরে জানান, বর্তমানে এক লাখের বেশি রুশ নাগরিক মান্দারিন শিখছেন এবং প্রায় ২০ হাজার রুশ শিক্ষার্থী চীনে গিয়ে ভাষাটি অধ্যয়ন করছেন।
রাশিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের মেয়ে রুশ ভাষার আগেই চীনা ভাষা শিখেছিলেন। কারণ তাদের বাসায় কর্মরত একজন পরিচর্যাকারী চীনা ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাডও মান্দারিন ভাষায় সাবলীল। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি চীনের অনেক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি মান্দারিন ভাষায় আলোচনা করেছেন।
তবে অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানরা ভাষাটি শিখলেও পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চীনা ভাষা শেখার আগ্রহ বরং কমছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চীনবিষয়ক ভাষা শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য হারে ভাটা পড়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের এসব তরুণ-তরুণী ভবিষ্যতে মান্দারিন ভাষা শিক্ষার দূত হিসেবে কাজ করতে পারেন। তবে তারা ভাষাটি কতটা গভীরভাবে আয়ত্ত করছেন, তা এখনই বলা কঠিন।
তার মতে, ইউরোপীয়দের জন্য চীনকে বোঝা ফ্রান্স বা জার্মানিকে বোঝার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তাই চীনের সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ায় ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ বাড়িতে মান্দারিন ভাষায় কথা বলেন। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৯ কোটি মানুষের মাতৃভাষা মান্দারিন। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারীদের যুক্ত করলে এ সংখ্যা প্রায় ১১৮ কোটিতে পৌঁছায়।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কার্স্টি ডাফ বলেন, তিনি পরিবারে চীনা ভাষায় বড় হয়েছেন। পরে রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে মান্দারিনও অধ্যয়ন করছেন।
তার ভাষায়, নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়া ও চীনের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি করাই তার লক্ষ্য।
তিনি জানান, পেশাদার যোগাযোগের ওয়েবসাইটে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু মান্দারিন জানার কারণেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
কার্স্টি ডাফ বলেন, ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দক্ষ মান্দারিনভাষী জনবল অত্যন্ত প্রয়োজন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, চীনে প্রায় সব শিক্ষার্থী ইংরেজি শেখে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক নয়।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা খাতে পরিচালিত এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশটিতে এশীয় ভাষা শেখার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে কমছে। অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব দ্য হিউম্যানিটিজ জানিয়েছে, চীনবিষয়ক উচ্চশিক্ষা থাকা ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র সাতটিতে ভাষাসহ চীনবিষয়ক সম্মান কোর্স রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে মাত্র তিন থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী ভাষাসহ চীনবিষয়ক সম্মান ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, পূর্ব এশিয়ার নির্দিষ্ট ভাষাগুলো কতজন শিক্ষার্থী পড়ছেন, সে বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি নিরূপণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টের শিক্ষা কমিটির তথ্যমতে, ২০০৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভাষা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ডা. নিং ঝাং বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া দুঃখজনক। বিশেষ করে মান্দারিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভাষার ক্ষেত্রে এটি উদ্বেগের বিষয়।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাষা অনুবাদে সহায়ক হলেও চীনা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রকৃত গভীরতা বোঝাতে পারে না। কারণ চীনা সমাজ মূলত মানবিক সম্পর্ক, আস্থা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ভাষা শেখা মানে শুধু শব্দ মুখস্থ করা নয়। ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি, ইতিহাস, সামাজিক আচরণ ও মানুষের চিন্তাধারাও জানতে হয়। চীনা সমাজ, হংকং, তাইওয়ান কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো চীনাভাষী অঞ্চলে সরাসরি মানুষের সঙ্গে মিশে ভাষা শেখাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী এলিজা ব্যারট-ওয়ালশও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চীনা ভাষা তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে, অনেক অর্থ ইংরেজিতে অনুবাদের সময় হারিয়ে যায়।
তার মতে, মান্দারিন শেখার মাধ্যমে তিনি শুধু ভাষাগত দক্ষতাই অর্জন করেননি, বরং চীনে ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কও গড়ে তুলতে পেরেছেন, যা ভবিষ্যতে তার কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে এশীয় ভাষা শিক্ষার প্রসারে অস্ট্রেলিয়া সরকার সম্প্রতি প্রায় ২৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ ভিক্টোরিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলস ও অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরির নয়টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এশীয় ভাষা শেখানোর কাজে ব্যয় করা হবে।
সরকারের এই কর্মসূচির আওতায় মান্দারিন ছাড়াও বাংলা, হিন্দি, জাপানি, কোরীয়, ইন্দোনেশীয়, থাই, ভিয়েতনামি, তামিল, উর্দু, নেপালি, পাঞ্জাবি, বার্মিজ, ফিলিপিনো, গুজরাটি, সিংহলি, তেলুগু এবং ক্যান্টনিজসহ বিভিন্ন এশীয় ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ