প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ। আজ দুপুরে তোলা, ছবি: প্রথম আলো
মেলবোর্ন, ১১ জানুয়ারি- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সময় এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্র সংসদের (চাকসু) কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। শনিবার দুপুরে আইন অনুষদের সামনে আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁর মুঠোফোন তল্লাশিও করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
দুপুর ১২টার দিকে আইন অনুষদের সামনে ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাকসুর চার নেতার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী ওই শিক্ষককে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়। বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। প্রক্টরিয়াল বডি ও চাকসু নেতারা তাঁর মুঠোফোন তল্লাশি করেন।
হেনস্তার শিকার শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি ক্যাম্পাসে আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রক্টরও ছিলেন।
ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এক মিনিট সাত সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ছাত্র শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একজন তাঁকে পেছন থেকে চেপে ধরেছেন। ভিডিওতে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি এবং নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা যায়। ওই সময় শিক্ষককে চিৎকার করতে শোনা যায়।
প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে হাসান মোহাম্মদ বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার সময় শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাঁকে জানান, পরিস্থিতি ভালো নয়। এ কারণে তিনি কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসেন। তখন চাকসু নেতারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এরপরও তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে মব তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে চাকসুর আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সহকারী প্রক্টর থাকাকালে হাসান মোহাম্মদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ভূমিকা রেখেছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সরাসরি গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁদের অভিযোগ। এসব বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত চলছিল। তদন্ত চলাকালে একজন অভিযুক্ত শিক্ষক কেন পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করছেন, তা জানতে তাঁরা আইন অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা বলতে যান। তাঁদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই শিক্ষক পালানোর চেষ্টা করেন এবং পড়ে গিয়ে আঘাত পান।
একই দাবি করেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষককে কোনোভাবেই মারধর করা হয়নি। আইন অনুষদে পরিদর্শনের সময় তাঁর উপস্থিতির খবর পেয়ে তাঁরা সেখানে যান। গ্যালারির পেছন দিয়ে দৌড়ানোর সময় তিনি ব্যথা পান।
তবে জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা বা সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি এক দিনের জন্যও বাইরে বের হননি এবং কোনো দায়িত্বেও ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো মৌন মিছিলেও অংশ নেননি। শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের কোনো বোর্ডের সদস্য ছিলেন না বলেও দাবি করেন। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কাউকে মামলা দেননি বলে তিনি জানান।
এদিকে পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্ত চললেও সিন্ডিকেট থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ কারণেই তাঁকে পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, হাসান মোহাম্মদ আগের পরীক্ষাগুলোতেও দায়িত্ব পালন করেছেন। হট্টগোলের খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। বর্তমানে তাঁর মুঠোফোন তল্লাসিসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে। এমন অবস্থায় তিনি কীভাবে পরীক্ষার দায়িত্ব পেলেন, তা খতিয়ে দেখা হবে।
ঘটনাটি ঘিরে ক্যাম্পাসে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষক হেনস্তার অভিযোগ ও চাকসু নেতাদের পাল্টা দাবির মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার পরিবেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।