দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৮ জুন- দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। বুধবার সন্ধ্যায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর শুক্রবার দেশটির উত্তর উপকূলে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সর্বশেষ ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া না গেলেও দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানিয়েছে, শুক্রবারের ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল উত্তর ভেনেজুয়েলার মারাকাই শহর থেকে প্রায় ৬১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটি রাজধানী কারাকাসসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও অনুভূত হয়েছে।
স্কাই নিউজ অস্ট্রেলিয়া ও আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবারের পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প উত্তর ভেনেজুয়েলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। রাজধানী কারাকাসের বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং বিভিন্ন এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল এখনও জীবিতদের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বুধবারের জোড়া ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৩৬০ জন। এছাড়া ১৭২ জনেরও বেশি মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান শেষ হলে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ বহু মানুষ এখনও ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা রয়েছেন এবং অনেক দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সাময়িকভাবে সীমিত করা হবে, যাতে উদ্ধারকাজ দ্রুত ও নিরাপদভাবে পরিচালনা করা যায়। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
সরকারি তৎপরতার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও স্বেচ্ছায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় মানুষ নিজেরাই দল গঠন করে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়িকে অস্থায়ী অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছেন।
উদ্ধার ও জরুরি যোগাযোগ সহজ করতে ভেনেজুয়েলা সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সসহ কয়েকটি প্ল্যাটফর্মের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। ২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এসব প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজখবর আদান-প্রদান এবং জরুরি তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষমাণ ২৫ বছর বয়সী জেনিফার পালাসিওস জানান, তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে এবং আরও পাঁচজন স্বজন এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টাতেই অনেককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে বড় বড় কংক্রিটের স্ল্যাব সরাতে জরুরিভাবে ক্রেন ও ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, এখনও অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের ভেতরে জীবিত অবস্থায় আটকা থাকতে পারেন।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকারী দলও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ বিতরণ এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করেছে।