(বামে) ডকুমেন্টারিতে মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি, (ডানে) মিজানুর রহমান সোহেল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট- ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে’ শহীদ সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় জীবিত সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি ব্যবহার করে তাকে শহীদ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত উপস্থাপনায় তাঁর ছবির সঙ্গে অন্য এক সাংবাদিকের নাম দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংবাদিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ)। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।
সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলের অভিযোগ, অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি প্রেজেন্টেশনে তাঁর ছবি ব্যবহার করে তাঁকে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জে ‘শহীদ’ হয়েছেন বলে দেখানো হয়। তবে ছবির সঙ্গে তাঁর নাম ব্যবহার না করে সাংবাদিক সোহেল আকাঞ্জির নাম উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পর নিজের পরিচয় নিশ্চিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে মিজানুর রহমান সোহেল বলেন, তিনি পেশায় লেখক ও সাংবাদিক এবং তিনি জীবিত আছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি মিজানুর রহমান সোহেল। পেশায় লেখক ও সাংবাদিক। এবং হ্যাঁ, আমি এখনো জীবিত আছি।’
সোহেল জানান, অনুষ্ঠানের পর থেকেই পরিচিতজন, সহকর্মী ও বিভিন্ন সাংবাদিক তাঁকে ফোন করে তাঁর বেঁচে থাকা নিয়ে জানতে চাইছেন। ফলে তাঁকে বারবার বলতে হচ্ছে, ‘আমি মরি নাই।’
তিনি বলেন, একজন জীবিত মানুষকে মৃত বা শহীদ হিসেবে উপস্থাপন করা শুধু সাধারণ একটি তথ্যগত ভুল নয়। এর সঙ্গে একজন ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত পরিচয় জড়িত। ভুল তথ্যটি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ওই ব্যক্তির পরিবার, স্বজন, পরিচিতজন ও সহকর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়ে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা ও তথ্য যাচাই প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তিনি।
সোহেল প্রশ্ন তোলেন, একজন জীবিত সাংবাদিকের নাম ও ছবি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের একটি উপস্থাপনায় ব্যবহারের আগে তথ্য যাচাই করা হয়নি কেন। কারা তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করেছেন এবং কার অনুমোদনের পর উপস্থাপনাটি অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা ও সংশোধন চান।
তবে তিনি এ ঘটনায় কাউকে অযথা অভিযুক্ত করতে চান না বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ভুলটি কীভাবে হয়েছে এবং এর দায় কার, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।
ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্সের আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়েছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করা সাংবাদিকদের স্মৃতিচারণ এবং তাঁদের ভূমিকা তুলে ধরতেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় একজন জীবিত সাংবাদিকের ছবি ভুলভাবে ব্যবহার করে তাঁকে শহীদ হিসেবে দেখানোর ঘটনায় তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের তথ্যচিত্রে শহীদ সাংবাদিকের নাম ঠিক ছিল। তবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছবিটি ভুল ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি সংশোধন করা হবে এবং এ নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পরে এনসিপির মিডিয়া সেল থেকে এ ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ঘটনাটি একান্তই ভুলবশত হয়েছে। দেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার জগতে মিজানুর রহমান সোহেল পরিচিত নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রতি এবং সংশ্লিষ্ট সবার কাছে দুঃখপ্রকাশ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টির মিডিয়া, ব্র্যান্ডিং ও প্রচারবিষয়ক উপকমিটির পক্ষ থেকে মিজানুর রহমান সোহেলসহ সবার কাছে দুঃখপ্রকাশ করা হচ্ছে এবং বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের তালিকা, ছবি ও পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে শহীদদের পরিচয় সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য প্রকাশের আগে নির্ভুলভাবে যাচাই করা না হলে একদিকে যেমন জীবিত ব্যক্তির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে প্রকৃত শহীদদের পরিচয়ও ভুলভাবে উপস্থাপিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।