বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনিরা। ছবি: আল জাজিরা
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় এক লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে নিরাপত্তার সন্ধানে হাজারো মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বাব আল-মানদাব প্রণালি পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী জিবুতিতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, পশ্চিম উপকূলে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনের ভেতরেই এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেক পরিবার খুব অল্প সময়ের নোটিশে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তাদের সঙ্গে নেওয়ার মতো ছিল খুব সামান্য জিনিসপত্র। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের জন্য আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সুরক্ষা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বাগতিক সম্প্রদায়গুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এসব এলাকার অনেক সম্প্রদায় আগে থেকেই সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন তাদের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যবস্থাকে আরও সংকটে ফেলছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ইউএনএইচসিআর নতুন করে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার তহবিল প্রয়োজন বলে জানিয়েছে। জিবুতিতে পৌঁছানো মানুষদের জন্যও অতিরিক্ত মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে।
বাব আল-মানদাব পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে পালাচ্ছে মানুষ
সংঘাতের প্রভাব এখন ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও পড়তে শুরু করেছে। নিরাপত্তার জন্য হাজারো মানুষ বাব আল-মানদাব প্রণালি পাড়ি দিয়ে জিবুতির দিকে যাচ্ছেন। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সাম্প্রতিক চার দিনে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ এই সমুদ্রপথে জিবুতিতে পৌঁছেছেন। তাদের বড় অংশ নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ।
এর আগে জিবুতির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ দেশটির উত্তর উপকূলে পৌঁছেছেন। তাদের অনেকেই ছোট নৌকা থেকে শুরু করে বড় নৌযানে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। কেউ কেউ জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে সমুদ্রের মধ্যে আটকা পড়ার পর উদ্ধার হয়েছেন।
জিবুতির উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলের শহর ওবক এই নতুন আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের উপকূল থেকে বাব আল-মানদাবের অপর পারে অবস্থিত এই শহরটি যুদ্ধের সময় ইয়েমেন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য আগে থেকেই পরিচিত আশ্রয়স্থল।
জিবুতি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তারা প্রায় ১০ হাজার মানুষকে গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নতুন করে আসা মানুষদের আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে।
আগেও কয়েক দফা বাস্তুচ্যুত হয়েছে বহু পরিবার
চলমান সংঘাতে বাস্তুচ্যুত হওয়া অনেক পরিবার এর আগেও ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে একাধিকবার ঘরবাড়ি ছেড়েছে। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইয়েমেনের অভ্যন্তরে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে এক লাখ ছাড়িয়েছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় পুরো গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলে মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। মাকবানাহ, জাবাল হাবাশি ও আল-মাআফেরসহ কয়েকটি এলাকায় লড়াই থেকে বাঁচতে হাজারো পরিবার পালিয়ে যায়।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত এক নারী আয়েশা মুহাম্মদের পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। মোখা বন্দরে হুথি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর তিনি তার পাঁচ সন্তানকে গ্রামে রেখে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়ি থেকে বের হতে পারছিলেন না বলে তিনি জানান।
আরেক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি হুসেইন হায়দারা জানিয়েছেন, গোলাবর্ষণ ও স্নাইপার হামলার আতঙ্কে তাকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দ্রুত পালাতে হয়েছে। এসব ঘটনা নতুন করে সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকির মাত্রা তুলে ধরছে।
ইয়েমেনে থাকা শরণার্থীরাও ঝুঁকিতে
শুধু ইয়েমেনের নাগরিকরাই নয়, দেশটিতে আগে থেকেই অবস্থান করা শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীরাও নতুন সংঘাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ইয়েমেনে নিবন্ধিত ৬৫ হাজারের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী বর্তমানে সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া থেকে আসা।
ফলে নতুন করে বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনিদের পাশাপাশি আগে থেকেই যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা অভিবাসী ও শরণার্থীদের জন্যও মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়ছে।
বাব আল-মানদাব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নতুন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। হুথি বাহিনী ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে। এর ফলে কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে।
বাব আল-মানদাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর। ফলে এই জলপথে সংঘাত বা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ওপরও পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাব আল-মানদাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প সামুদ্রিক পথ হিসেবে বাব আল-মানদাবের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বাড়ার ফলে এখন একদিকে দেশটির অভ্যন্তরে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সীমান্ত পেরিয়ে জিবুতিতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, সহিংসতা অব্যাহত থাকলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং সীমিত মানবিক সহায়তার ওপর চাপও তীব্র হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা