আরও তিন মাস দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছেন ডাকসুর নেতারা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান কমিটির এক বছরের নিয়মিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ আরও…
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের প্রয়াত মা মেরিয়ান আলবানিজকে নিয়ে করা সমালোচনামূলক মন্তব্যের জেরে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন দেশটির ওয়ান নেশন দলের নেতা সিনেটর পলিন হ্যানসন। সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার তিনি দুই বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে সরাসরি নিজের মন্তব্যকে ভুল বা আপত্তিকর বলে স্বীকার না করে ‘কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে’ দুঃখ প্রকাশ করায় তাঁর বক্তব্যকে ‘শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় হ্যানসনের পুরোনো একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকার নতুন করে সামনে আসার পর। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রক্ষণশীল ঘরানার ‘জেমি জে’ পডকাস্টে অস্ট্রেলিয়ার স্কুলের পাঠ্যক্রমে আদিবাসী ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষা পড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ওই আলোচনায় তিনি আদিবাসী অস্ট্রেলীয়দের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম জাতি’ বলে মন্তব্য করেন এবং তাঁদের ঐতিহাসিক অর্জন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
হ্যানসনের মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এর তীব্র সমালোচনা করেন। আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী মালার্নদিরি ম্যাকার্থি তাঁর মন্তব্যকে অবমাননাকর ও বর্ণবাদী হিসেবে উল্লেখ করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য অস্ট্রেলিয়ার সমাজে বিভাজন বাড়ায় এবং তিনি এমন বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে হ্যানসনের বক্তব্য নিয়ে শুধু সরকারি দল বা আদিবাসী নেতারাই আপত্তি তোলেননি। বিভিন্ন দলের রাজনীতিকরাও তাঁর মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। লিবারেল সিনেটর ও আদিবাসী নেতা কেরিন লিডল মন্তব্যগুলোকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করেন। আরেক আদিবাসী সিনেটর জাসিন্টা ন্যাম্পিজিনপা প্রাইস বলেন, আদিবাসী ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক থাকলেও হ্যানসন আলোচনাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বাধীন সিনেটর লিডিয়া থর্পও হ্যানসনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার প্রজন্ম ধরে দেশটির ভূমি, পানি ও পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে। আদিবাসী লেখক ও মানবাধিকারকর্মী থমাস মায়োও হ্যানসনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আদিবাসী ও টরেস স্ট্রেইট দ্বীপপুঞ্জের জনগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে আইন, শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিল কাঠামো গড়ে তুলেছে।
‘কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখিত’
তীব্র সমালোচনার পর মঙ্গলবার ক্যানবেরায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন হ্যানসন। সেখানে আদিবাসীদের নিয়ে তাঁর মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই বক্তব্যে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখিত। তিনি দাবি করেন, কাউকে অপমান বা আঘাত করার উদ্দেশ্যে ওই মন্তব্য করেননি।
হ্যানসন বলেন, ‘প্রিমিটিভ’ বা ‘আদিম’ শব্দ ব্যবহারের কারণে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর অবস্থান হলো অস্ট্রেলিয়ার সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করা উচিত এবং জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে প্রয়োজনের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে আচরণ করা উচিত।
তবে তাঁর বক্তব্যে সরাসরি ‘আমি ভুল করেছি’ ধরনের স্বীকারোক্তি না থাকায় বিতর্ক থামেনি। এবিসি তাঁর বক্তব্যকে ‘qualified apology’, অর্থাৎ শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ম্যাডেলিন কিংও বলেন, ‘আমি যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে দুঃখিত’ ধরনের বক্তব্যকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষমা হিসেবে দেখা কঠিন।
আলবানিজের প্রয়াত মাকেও কটূক্তি
এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের প্রয়াত মা মেরিয়ান আলবানিজকে নিয়ে হ্যানসনের পুরোনো মন্তব্যও নতুন করে আলোচনায় আসে। আলবানিজের মা দীর্ঘ সময় সরকারি আবাসনে বসবাস করেছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে হ্যানসন প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং বলেছিলেন, সরকারি আবাসনে কেউ কয়েক দশক ধরে বসবাস করবেন, এমনটা হওয়া উচিত নয়।
আলবানিজ তাঁর শৈশবের কথা বলতে গিয়ে বহুবার জানিয়েছেন, তিনি সিডনির অভ্যন্তরীণ পশ্চিমাঞ্চলের সরকারি আবাসনে তাঁর মায়ের সঙ্গে বড় হয়েছেন। তাঁর মা মেরিয়ান ২০০২ সালে মারা যান। আলবানিজ তাঁর মায়ের জীবন ও চরিত্র নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন এবং সম্প্রতি হ্যানসনের মন্তব্যের জবাবও দিয়েছেন।
আলবানিজ বলেন, তাঁর মা ছিলেন অত্যন্ত ভালো চরিত্রের একজন মানুষ এবং তিনি তাঁর মায়ের জন্য গর্বিত। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা করা হলে তিনি তা গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু তাঁর প্রয়াত মাকে আক্রমণ করা ভিন্ন বিষয়।
মেরিয়ান আলবানিজ গুরুতর রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ভুগতেন এবং জীবনের বড় একটি সময় সরকারি আবাসনে কাটিয়েছেন। হ্যানসনের মন্তব্যের পর বিভিন্ন রাজনীতিক তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
এবারও ‘যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন’
প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত মাকে নিয়ে করা মন্তব্য সম্পর্কে সাংবাদিকেরা হ্যানসনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর মন্তব্যকে তিনি অবমাননাকর মনে করেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল সরকারি আবাসনব্যবস্থা নিয়ে, মেরিয়ান আলবানিজকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর কথায় কষ্ট পেয়ে থাকেন, সে জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
এই বক্তব্য নিয়েও একই ধরনের সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকেরা বলছেন, সরাসরি নিজের মন্তব্য প্রত্যাহার বা ভুল স্বীকার না করে ‘কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে’ দুঃখ প্রকাশ করা দায় এড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করে।
অন্যদিকে হ্যানসন দাবি করেছেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য বর্তমান সময়ের মানুষের বিষয়ে ছিল না। তিনি পরে ব্যাখ্যা দেন, অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশ বসতি স্থাপনের সময়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি ওই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ওই মন্তব্য করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না এবং তিনি এ বক্তব্য দেওয়ার জন্য অনুতপ্ত।
রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র
হ্যানসনের মন্তব্যের জেরে অস্ট্রেলিয়ার সিনেটেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী ম্যাকার্থি বলেছেন, হ্যানসনের বক্তব্যের পর কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি সিনেটের বিষয়।
এরই মধ্যে হ্যানসনের বক্তব্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরলভাবে বিভিন্ন দলের নেতাদের সমালোচনা এক জায়গায় এসেছে। তবে হ্যানসনের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা ওয়ান নেশনের নীতির বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করার কথাও বলেছেন কয়েকজন রাজনীতিক।
ন্যাশনালস পার্টির নেতা ম্যাট ক্যানাভান হ্যানসনের মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন এবং একটি জনগোষ্ঠী বা ইতিহাসের একটি অংশকে হেয় করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন। লিবারেল ফ্রন্টবেঞ্চার অ্যান্ড্রু হ্যাস্টি হ্যানসনের দুঃখ প্রকাশকে স্বাগত জানালেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যের সঙ্গে নিজের স্পষ্ট দ্বিমত জানিয়েছেন।
এদিকে হ্যানসনের বক্তব্যের সমালোচনা শুধু রাজনৈতিক মহলেই সীমাবদ্ধ নেই। আদিবাসী নেতারা তাঁর মন্তব্যকে ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, জ্ঞান ও সামাজিক কাঠামোকে উপেক্ষা করে তাঁদের ‘আদিম’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঐতিহাসিক বাস্তবতার একটি বড় অংশকে অস্বীকার করে।
ফলে দুই দফা দুঃখ প্রকাশ করলেও পলিন হ্যানসনকে ঘিরে বিতর্ক আপাতত থামেনি। বরং তাঁর ‘যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন’ ধরনের ক্ষমা চাওয়ার ভাষা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে আদিবাসী অস্ট্রেলীয়দের ইতিহাস ও অধিকার এবং প্রধানমন্ত্রী আলবানিজের পারিবারিক পটভূমি নিয়ে তাঁর মন্তব্য অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তপ্ত বিতর্ক তৈরি করেছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au