এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবি, প্রয়োজনে হরতালে যাওয়ার ঘোষণা জোটের
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। একই সঙ্গে সোমবার (১২ অক্টোবর) বন্দর…
আজ ১১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। বিশ্বব্যাপী দিবসটি উপলক্ষে কন্যাশিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘এন্ড চাইল্ড ম্যারেজ অ্যান্ড ইনভেস্ট ইন গার্লস রাইটস’।
বাংলায় যার অর্থ, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করুন এবং মেয়েদের অধিকার সুরক্ষায় বিনিয়োগ করুন’। অথচ বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে কমার গতি এতটাই ধীর যে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)।
উদ্বেগের বিষয়, একদিকে ১৮ বছরের আগে বিয়ের সামগ্রিক হার কমলেও অন্যদিকে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে বিবাহিতের হার বেড়েছে।
প্রতি বছর ১১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়। দিবসটি ঘিরে বিভিন্ন দেশে কন্যাশিশুদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সভা-সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্যেও বাল্যবিয়ে বন্ধের পাশাপাশি মেয়েদের অধিকার সুরক্ষায় বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেশে বাল্যবিয়ের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত জরিপটি গত রোববার প্রকাশ করা হয়।
জরিপ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ২০১৯ সালের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীর হার একই সময়ে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ, বাল্যবিয়ে বন্ধে কিছু অগ্রগতি হলেও কিশোরীদের একটি বড় অংশ এখনও অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হচ্ছে। এর ফলে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাল্যবিয়ের পেছনে দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ, মেয়েদের শিক্ষার প্রতি অবহেলা এবং পুরোনো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইউএনএফপিএ জানায়, এমআইসিএস জরিপে নারী ও মেয়েদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জের মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। জরিপের ১৭২টি সূচকের মধ্যে ২৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সম্পর্কিত। শিশু মৃত্যুহার কমা এবং মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় উন্নতির মতো ইতিবাচক দিক থাকলেও বাল্যবিয়ে নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
ইউএনএফপিএর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে কমার বার্ষিক হার মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ। এই গতি অব্যাহত থাকলে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি নির্মূল হতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। সংস্থাটির মতে, এ পরিস্থিতি দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বড় বাধা।
বাড়ছে কিশোরী মাতৃত্ব
বাল্যবিয়ের পাশাপাশি কিশোরী মাতৃত্বের হারও বেড়েছে। জরিপে কিশোরী মাতৃত্বের হার ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে। প্রতি এক হাজার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়ের মধ্যে বছরে কতজন সন্তান জন্ম দিচ্ছে, এ হার দিয়ে তা পরিমাপ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ কিশোরীদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণসেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এবং সেবা না পাওয়াও এ সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। ফলে অনেক কিশোরী বাল্যবিয়ে ও অল্প বয়সে মাতৃত্বের চক্রে আটকে পড়ছে।
ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়। কিন্তু মেয়েদের স্বাস্থ্য, অধিকার ও শিক্ষায় বিনিয়োগ ছাড়া এসব লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়।
ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, বাল্যবিয়ে শুধু একটি ক্ষতিকর প্রথা নয়, এটি শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা। এর ফলে মেয়েদের শিক্ষা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বিয়ের বয়স কমানোর পরিবর্তে আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কিশোরীরা
চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ কিশোরীদের জন্য নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মনজুর-এ-মাওলা বলেন, কিশোরীদের শরীর গর্ভধারণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকায় রক্তশূন্যতা, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, সময়ের আগে সন্তান প্রসব এবং কম ওজনের শিশুর জন্মের ঝুঁকি বাড়ে। শারীরিক অপরিপক্বতার কারণে প্রসব জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সে বিয়ের ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নতুন দায়িত্ব, দাম্পত্য চাপ ও স্বাধীনতা হারানোর কারণে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বাড়তে পারে। অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস কমে এবং সহিংসতা ও একাকিত্বের ঝুঁকি বাড়ে।
জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বাল্যবিয়ে দারিদ্র্য, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায় এবং জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। তাঁর মতে, কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় শিক্ষা, সচেতনতা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, বিয়ের পরও অনেক মেয়ে পরিবারের মধ্যে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পায় না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব কম দেওয়া হয়। কোনোভাবেই বাল্যবিয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েদের সমাজে অর্থবহ অবদান রাখার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
তাঁর মতে, কন্যাশিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
আইন প্রয়োগে জোর
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ১২ হাজার বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর সহযোগিতাও প্রয়োজন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ধর্ম মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে কেউ কেউ বাল্যবিয়েকে সমর্থন করার চেষ্টা করেন। তবে এ ক্ষেত্রে জাতীয় আইন অনুসরণ করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au