সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযোগের বিস্তারিত জানতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের দূতাবাস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, নিহত নজরুল ইসলামের পরিবারও সৌদি আরবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অন্ধকারে ছিল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম এবং টাঙ্গাইলের সিথি আখতার। সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তাঁদের নাম যথাক্রমে ‘নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির’ ও ‘সিতি আখতার’ হিসেবে উল্লেখ করে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সিতে বিবৃতিটি প্রকাশিত হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, কোন মসজিদে ঘটনাটি ঘটেছিল এবং ঠিক কবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাঁরা কারাগারে ছিলেন। কিন্তু তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার বা সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনকে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি। ফলে তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়নি।
১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার বা আটক হলে তাঁর অনুরোধে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলার কার্যালয়কে দ্রুত অবহিত করার বিধান রয়েছে। তবে নজরুল ইসলাম ও সিথি আখতারকে গ্রেপ্তারের সময় কিংবা বিচার চলাকালে এই অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেলও ঢাকাকে জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবরে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবার
নজরুল ইসলামের পরিবারের দাবি, আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর সৌদি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
নজরুলের মা রহিমা বেগম সংবাদমাধ্যম নিউ এজকে জানান, ছেলের সঙ্গে প্রায় এক মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে কারাগার থেকে ফোন করে নজরুল তাঁর কাছে দোয়া চান এবং নিজেকে ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেন।
রহিমা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে ছিলেন নজরুল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র তিন দিন আগে, ১১ অক্টোবরও মায়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সেদিন ছেলের কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু বুঝতে পারেননি তিনি। নজরুল স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিলেন এবং মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন।
ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর পরিবার দ্রুত তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে। রহিমা বেগম জানান, এই খবর শোনার পর তাঁর কৃষক স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একই খবর শুনে নজরুলের এক ফুফু স্ট্রোকে মারা গেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
নজরুলের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ, সিথির বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ এনেছিল। অন্যদিকে, সিথি আখতারের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে অভিযোগগুলোর বিস্তারিত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ভিত্তি সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার এখনো নিশ্চিত তথ্য পায়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট মিশনকে কিছু জানানো হয়নি। ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ জানতে পারে, দুই প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট অপরাধ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের মিশনকে আগে থেকে অবহিত না করার কারণ জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সোমবার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি আরও জানান, সরকার এখনো ঘটনার বিস্তারিত তথ্য পায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বিভিন্ন তালিকায় দুই বাংলাদেশির নাম রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে রোববার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় ব্যাখ্যা চাইতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াহকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়।
সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগে দেশটির কারাগারে পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটক রয়েছেন। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশকে অবহিত না করার ঘটনায় প্রবাসীদের আইনি অধিকার ও কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।