মতামত

বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন

লেখক:প্রদীপ কুমার জয়ধর

  • 4:07 am - October 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৪ বার
বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন। ছবি: সংগৃহীত

শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস, ঢাকের মধুর বাদ্য আর চারদিকে উৎসবের আমেজ—এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আনন্দ, ভক্তি, আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়, তা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পরিণত হয় বাঙালির চিরন্তন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন এবং সম্মিলিত আবেগের এক অনন্য প্রকাশে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেবী দুর্গার আগমন ভক্তদের মনে যে আনন্দের সঞ্চার করে, কয়েক দিনের পূজা-অর্চনা, আরাধনা ও উৎসবের পর বিজয়া দশমীতে তাঁর বিদায় সেই আনন্দের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় গভীর বিষণ্নতা।

বিজয়া দশমী শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন। এই দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। তবে বিসর্জন মানে কেবল একটি মাটির প্রতিমার দৃশ্যমান উপস্থিতির অবসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনি, প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম, জীবনের অনিত্যতা, মানবিক সম্পর্ক এবং নতুন করে ফিরে আসার প্রত্যাশা। দেবী দুর্গার বিদায় ভক্তদের মনে যেমন বিচ্ছেদের বেদনা সৃষ্টি করে, তেমনি ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনি তাঁদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে নতুন আনন্দ ও আশার আলো।

দর্পণ বিসর্জন, সিঁদুর খেলা, প্রতিমা নিরঞ্জন, বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি এবং মিষ্টিমুখ—বিজয়া দশমীর প্রতিটি আচার ও প্রথার মধ্যে রয়েছে নিজস্ব তাৎপর্য। একই সঙ্গে এই দিন মানুষকে শেখায় অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের চিরন্তন শিক্ষা। তাই বিজয়া দশমী কেবল বিদায়ের দিন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, মানবিকতা ও নতুন সূচনার এক মহিমান্বিত উপলক্ষ।

দেবী দুর্গার আগমন ও কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের পৌরাণিক বিশ্বাস

হিন্দু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে রয়েছে গভীর আবেগময় বিশ্বাস। প্রচলিত বাঙালি লোকাচার ও ধর্মীয় কল্পনায় দেবী দুর্গা প্রতিবছর শরৎকালে তাঁর সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যলোকে, অর্থাৎ পিতৃগৃহে আগমন করেন। দেবীকে এখানে কেবল অসুরবিনাশিনী মহাশক্তি হিসেবে নয়, বরং পরিবারের প্রিয় কন্যা, স্নেহময়ী জননী এবং মঙ্গলময়ী মাতৃরূপেও কল্পনা করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকেন গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী—যাঁদের উপস্থিতি পূজামণ্ডপকে এক পারিবারিক আবহে পরিপূর্ণ করে তোলে।

বাংলার সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতিতে বিবাহিত কন্যার পিতৃগৃহে আগমন একটি বিশেষ আনন্দের ঘটনা। দীর্ঘদিন পর প্রিয় কন্যা বাড়িতে ফিরে এলে পরিবারে যেমন আনন্দের জোয়ার আসে, তেমনি তাঁর ফিরে যাওয়ার সময় সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। দেবী দুর্গার আগমন ও বিদায়ের মধ্যেও বাঙালি সেই পরিচিত পারিবারিক অনুভূতির প্রতিফলন দেখতে পায়। পূজার দিনগুলো যেন দেবীকে ঘিরে এক আনন্দময় পারিবারিক মিলনোৎসব, আর বিজয়া দশমী সেই মিলনের অবসানের দিন।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পূজা শেষে দেবী দুর্গা তাঁর স্বামী মহাদেবের আবাস কৈলাসে ফিরে যান। এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মনে জন্ম নেয় বিচ্ছেদের অনুভূতি। মণ্ডপে মণ্ডপে যখন বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন অনেকের চোখে জল এসে যায়। ঢাকের শব্দে, শঙ্খধ্বনিতে, উলুধ্বনিতে এবং ভক্তদের কণ্ঠে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনিতে ফুটে ওঠে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি।

দেবীর আগমন ও প্রত্যাবর্তনের এই কল্পনা বাঙালির ধর্মীয় অনুভূতিকে মানবিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দেবীকে আপনজন হিসেবে ভাবার মধ্য দিয়ে ভক্তরা তাঁর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করেন। ফলে প্রতিমা বিসর্জন তাঁদের কাছে কেবল একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পালন নয়, বরং প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর মতোই এক আবেগময় অভিজ্ঞতা।

বিজয়া দশমীর ধর্মীয় ও পৌরাণিক তাৎপর্য

বিজয়া দশমী হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেবী দুর্গার সঙ্গে মহিষাসুরের যুদ্ধের কাহিনি এই দিনের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষঙ্গ। পৌরাণিক বর্ণনা অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতা ও জগৎ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেবী মহিষাসুরকে পরাজিত করেন এবং অশুভ শক্তির অবসান ঘটান।

এই কাহিনি কেবল পৌরাণিক যুদ্ধের বিবরণ নয়; এর মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর প্রতীকী শিক্ষা। মহিষাসুরকে অহংকার, অত্যাচার, অন্যায় ও অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। অন্যদিকে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, ন্যায়, আত্মবিশ্বাস এবং শুভশক্তির প্রতীক। তাঁর বিজয় মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ।

বাঙালি সমাজে বিজয়া দশমী তাই দ্বিমাত্রিক অর্থ বহন করে। একদিকে এটি দেবী দুর্গার বিদায় ও প্রতিমা বিসর্জনের দিন, অন্যদিকে এটি শুভশক্তির বিজয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অশুভের বিনাশের আদর্শকে স্মরণ করার দিন। এই আদর্শের প্রকৃত বাস্তবায়ন ঘটে তখনই, যখন মানুষ ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, দুর্বল মানুষের পাশে থাকে এবং সত্য, সততা ও মানবিকতার পথ অনুসরণ করে।

দর্পণ বিসর্জন: বিদায়ের প্রথম অধ্যায়

বিজয়া দশমীর ধর্মীয় আচারগুলোর মধ্যে দর্পণ বিসর্জন একটি উল্লেখযোগ্য প্রথা। প্রচলিত পূজারীতিতে দর্পণ বা আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের মাধ্যমে এই আচার সম্পন্ন করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ও পূজাপদ্ধতিতে এর রীতিতে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণভাবে এটি দেবীর পূজা সমাপ্তির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতীকী আচার, যার মধ্য দিয়ে প্রতিমার আনুষ্ঠানিক বিদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

দর্পণে দেবীর প্রতিচ্ছবি দর্শনের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবনা নিহিত রয়েছে। প্রতিমার দৃশ্যমান রূপের মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর শক্তি, মহিমা ও মাতৃসত্তাকে অনুভব করেন। দর্পণের প্রতিচ্ছবি যেন সেই উপলব্ধিকে নিজের অন্তরে ধারণ করার প্রতীক। প্রতিমার সামনে উপস্থিত হয়ে ভক্তরা প্রার্থনা করেন, দেবী যেন তাঁদের পরিবার, সমাজ ও দেশকে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ দান করেন।

দর্পণ বিসর্জন আমাদের আরও একটি দার্শনিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়—দৃশ্যমান রূপ পরিবর্তনশীল, কিন্তু বিশ্বাস ও আদর্শ মানুষের অন্তরে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। প্রতিমা একসময় মণ্ডপ থেকে বিদায় নেবে, কিন্তু দেবীর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ভক্তদের হৃদয়ে থেকে যাবে। এই উপলব্ধিই দর্পণ বিসর্জনকে নিছক আচার থেকে আত্মিক অনুভূতির স্তরে উন্নীত করে।

সিঁদুর খেলা: নারীর আবেগ, সৌভাগ্য ও মঙ্গলকামনা

বিজয়া দশমীর অন্যতম পরিচিত ও আবেগঘন ঐতিহ্য হলো সিঁদুর খেলা। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত এই প্রথায় বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার কপালে ও চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর তাঁরা একে অপরের কপালে, সিঁথিতে কিংবা মুখে সিঁদুর পরিয়ে দেন। এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সৌভাগ্য, দাম্পত্য জীবনের মঙ্গল, পারিবারিক কল্যাণ এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস।

সিঁদুর খেলার সময় পূজামণ্ডপে এক বিশেষ আবহ তৈরি হয়। লাল সিঁদুরের রঙ, নারীদের হাসি, আনন্দ, পারস্পরিক শুভেচ্ছা এবং বিদায়ের আবেগ মিলেমিশে এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি করে। দেবীকে বিদায় জানানোর আগে তাঁকে সিঁদুর নিবেদন করার মধ্য দিয়ে ভক্ত নারীরা মাতৃরূপের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন। পরস্পরের মধ্যে সিঁদুর বিনিময়ের মাধ্যমে তাঁরা একে অপরের মঙ্গল কামনা করেন।

এই প্রথার সামাজিক তাৎপর্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি নারীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার একটি উপলক্ষ। পূজার আনন্দে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও শুভকামনা ভাগ করে নেন।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, সিঁদুর খেলা সব অঞ্চলে একইভাবে পালিত হয় না এবং এটি সব নারীর অংশগ্রহণের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় রীতি নয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক স্থানে বিভিন্ন বয়স ও বৈবাহিক অবস্থার নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই আয়োজন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠছে। এর মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে পারস্পরিক সম্মান, আনন্দ এবং মঙ্গলকামনায়।

প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা ও প্রকৃতিতে প্রত্যাবর্তন

বিজয়া দশমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগময় পর্ব হলো প্রতিমা বিসর্জন বা নিরঞ্জন। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর প্রতিমাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। মণ্ডপে তখন একদিকে থাকে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি, অন্যদিকে থাকে তাঁকে বিদায় জানানোর গভীর বেদনা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং ভক্তদের সম্মিলিত কণ্ঠে ‘শুভ বিজয়া’ ও ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনি পরিবেশকে আবেগঘন করে তোলে।

প্রতিমা বিসর্জনের জন্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ভক্তরা প্রতিমাকে কাঁধে বা নির্ধারিত যানবাহনে বহন করে নদী, পুকুর, হ্রদ কিংবা নির্দিষ্ট বিসর্জনস্থলে নিয়ে যান। সেখানে প্রচলিত ধর্মীয় রীতি অনুসারে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। অঞ্চলভেদে শোভাযাত্রা, বাদ্যযন্ত্র, প্রার্থনা এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় ভিন্নতা দেখা যায়।

বিসর্জনের মুহূর্তটি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ। যে প্রতিমার সামনে কয়েক দিন ধরে প্রার্থনা, অঞ্জলি, আরতি ও পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যে প্রতিমাকে ঘিরে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, সেই প্রতিমাকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের মন ভারী হয়ে ওঠে। কেউ নীরবে প্রণাম করেন, কেউ হাত জোড় করে প্রার্থনা করেন, আবার কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না। তবু এই বিষণ্নতার মধ্যেই উচ্চারিত হয় প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা—‘আসছে বছর আবার হবে’।

প্রতিমা বিসর্জনের গভীর তাৎপর্য প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেও নিহিত। প্রচলিত প্রতিমা নির্মাণে ব্যবহৃত মাটি, খড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান মানুষের হাতে দেবীর প্রতীকী রূপ ধারণ করে। পূজা শেষে সেই প্রতিমা আবার প্রকৃতির উপাদানের কাছে ফিরে যায়। এই চক্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জাগতিক জীবনের দৃশ্যমান রূপ স্থায়ী নয়। সৃষ্টি, বিকাশ, পরিবর্তন ও বিলয় প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম।

হিন্দু দর্শনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই প্রত্যাবর্তনকে অনিত্যতা, পরিবর্তন এবং প্রকৃতির চক্রের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। জীবনের আনন্দ যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি দুঃখও চিরস্থায়ী নয়। কোনো কিছুর দৃশ্যমান উপস্থিতির অবসান মানেই তার সমস্ত তাৎপর্যের অবসান নয়। প্রতিমা বিসর্জনের পরও দেবী দুর্গার আদর্শ, শক্তি ও মঙ্গলকামনার অনুভূতি মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়।

বিসর্জন ও পরিবেশ সংরক্ষণ: আধুনিক সময়ের দায়িত্ব

প্রতিমা বিসর্জনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নদী, পুকুর, হ্রদ ও অন্যান্য জলাশয় মানুষের জীবন, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিসর্জনের সময় প্রতিমার রং, প্লাস্টিক, ধাতব উপকরণ কিংবা অন্যান্য অবক্ষয়-অযোগ্য সামগ্রী জলাশয়ে মিশে গেলে পানি ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।

তাই প্রতিমা নির্মাণে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার, ক্ষতিকর রাসায়নিক রং পরিহার এবং প্লাস্টিকজাত সামগ্রীর ব্যবহার কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত বিসর্জনস্থল ব্যবহার, বর্জ্য সংগ্রহ এবং জলাশয় পরিষ্কারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। অনেক জায়গায় কৃত্রিম বিসর্জনকুণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়, যা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে প্রাকৃতিক জলাশয়ের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

ধর্মীয় আচার পালন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং প্রকৃতি ও জীবজগতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ধর্মীয় মূল্যবোধের মানবিক ও নৈতিক দিকের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেবী দুর্গাকে শক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধা জানালে প্রকৃতিকে রক্ষা করাও সেই শ্রদ্ধারই একটি বাস্তব প্রকাশ হওয়া উচিত।

বিসর্জনের আনন্দ যেন জলদূষণ, শব্দদূষণ কিংবা জননিরাপত্তার ঝুঁকির কারণ না হয়, সে বিষয়ে আয়োজক, ভক্ত ও প্রশাসন—সবার সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে তাকে সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাও জরুরি।

‘আসছে বছর আবার হবে’: প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার

প্রতিমা বিসর্জনের সময় সবচেয়ে আবেগঘন যে ধ্বনি বারবার শোনা যায়, তা হলো—‘আসছে বছর আবার হবে’। কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেন বাঙালির সমগ্র দুর্গোৎসবের আনন্দ, বেদনা ও প্রত্যাশা একসূত্রে গাঁথা হয়ে আছে। দেবীকে বিদায় জানানো হচ্ছে, কিন্তু সেই বিদায় চূড়ান্ত বিচ্ছেদের অনুভূতি তৈরি করে না। বরং এটি পরবর্তী আগমনের আশ্বাস বহন করে।

এই ধ্বনির মধ্যে রয়েছে জীবনের এক গভীর দর্শন। মানুষের জীবনে বিচ্ছেদ আসে, আনন্দের মুহূর্ত শেষ হয়, প্রিয়জন দূরে চলে যান এবং সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। কিন্তু জীবনের প্রবাহ থেমে থাকে না। অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মানুষকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

‘আসছে বছর আবার হবে’ তাই কেবল ধর্মীয় উৎসবের পুনরাবৃত্তির প্রত্যাশা নয়; এটি আশাবাদ, অধ্যবসায় এবং নতুন করে শুরু করার প্রতীক। যে মানুষ আজ বিদায়ের বেদনায় কাতর, সে-ই আগামী দিনে নতুন উৎসবের প্রস্তুতি নেবে। আজকের বিচ্ছেদ আগামী দিনের মিলনের সম্ভাবনাকে ধারণ করে রাখে।

বিজয়া দশমী: প্রণাম, কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখের ঐতিহ্য

প্রতিমা বিসর্জনের পর বিজয়া দশমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়—বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও মানুষের মধ্যে আনন্দ, ভালোবাসা ও সামাজিক যোগাযোগের উৎসব তখনও চলতে থাকে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করে ‘শুভ বিজয়া’ জানানোর রীতি বাঙালি সমাজে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

প্রচলিত রীতিতে ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। বড়রা ছোটদের স্নেহ, আশীর্বাদ ও শুভকামনা জানান। সমবয়সীরা কোলাকুলি করেন কিংবা আন্তরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। অনেক পরিবারে মিষ্টি, নাড়ু, নিমকি, সন্দেশসহ নানা ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। কোথাও কোথাও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানানোর বিশেষ আয়োজন থাকে।

এই প্রথার মধ্যে নিহিত রয়েছে বাঙালির পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সংস্কৃতির পরিচয়। দৈনন্দিন জীবনে ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা ব্যক্তিগত অভিমানের কারণে অনেক সময় মানুষের মধ্যে যোগাযোগ কমে যায়। বিজয়া সেই দূরত্ব কমানোর একটি উপলক্ষ তৈরি করে। মানুষ পুরোনো সম্পর্কের নবায়ন করে, ভুলত্রুটি ক্ষমা করে এবং নতুন করে সৌহার্দ্যের বন্ধন গড়ে তোলার সুযোগ পায়।

‘শুভ বিজয়া’ কথাটির অর্থ তাই কেবল উৎসব-পরবর্তী শুভেচ্ছা নয়। এর মধ্যে রয়েছে অন্যের জীবনে সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কামনা করার আন্তরিকতা। ধর্মীয় উৎসবের পরিসর ছাড়িয়ে এই শুভেচ্ছা মানুষের মধ্যে মানবিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।

বিজয়া দশমী ও বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়

দুর্গাপূজা বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, কারুশিল্প, পোশাক, খাদ্যসংস্কৃতি এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। পূজামণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা গঠন, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ—সবকিছু মিলিয়ে দুর্গোৎসব একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করে।

বিজয়া দশমী সেই পরিসরের আবেগময় সমাপ্তি। কয়েক দিন ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব, পারিবারিক মিলন এবং সম্মিলিত আনন্দ এই দিনে নতুন অর্থ লাভ করে। পূজার মণ্ডপে যে মানুষগুলো একত্রিত হয়েছিলেন, বিসর্জনের সময় তাঁরা একই আবেগে দেবীকে বিদায় জানান। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের মধ্যে সম্মিলিত স্মৃতি ও আত্মীয়তার অনুভূতি তৈরি করে।

বিশেষ করে প্রবাসে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমী মাতৃভূমির সংস্কৃতি ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নিজ জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও পূজার আয়োজন, প্রতিমা দর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন। প্রবাসে বসবাসকারী পরবর্তী প্রজন্মও এসব আয়োজনের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।

এভাবে বিজয়া দশমী শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আচার নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম।

বিজয়া দশমী ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

দুর্গোৎসবের অন্যতম মানবিক শিক্ষা হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির গুরুত্ব। একটি সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের মানুষ পরস্পরের বিশ্বাসকে সম্মান করে এবং শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে বহু স্থানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের উৎসবে অংশ নেন, শুভেচ্ছা জানান এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা বিনিময়ও এই আন্তরিকতার একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও মানুষের সুখ, শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা সর্বজনীন।

তবে সম্প্রীতি কেবল উৎসবের দিনে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার, পারস্পরিক সম্মান এবং আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সম্প্রীতির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে। কারও ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা সাংস্কৃতিক অনুশীলনের কারণে যেন কেউ বৈষম্য, অপমান বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

বিজয়া দশমী আমাদের সেই মানবিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। দেবী দুর্গার আরাধনা যদি শক্তি, ন্যায় ও শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক হয়, তবে তার বাস্তব শিক্ষা হওয়া উচিত দুর্বল ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সকলের মর্যাদা রক্ষা করা।

নারীশক্তি ও দেবী দুর্গার আদর্শ

দেবী দুর্গা হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে শক্তি, সাহস, প্রজ্ঞা এবং অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। তাঁর দশভুজা রূপে বিভিন্ন অস্ত্রের ধারণা শক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তিনি কেবল পূজিত দেবী নন; প্রতীকী অর্থে তিনি আত্মবিশ্বাস, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রেরণাও জোগান।

বিজয়া দশমীর প্রেক্ষাপটে দেবী দুর্গার এই আদর্শ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজে নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নে দেবীর শক্তির প্রতীকী অর্থ নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়। নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য ও অবমাননা দূর করার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

দেবীকে শক্তিরূপে আরাধনা করার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের নারীদের প্রতি সম্মান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের মণ্ডপে দেবীর বন্দনা তখনই গভীর অর্থ লাভ করে, যখন সমাজ নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় আন্তরিক হয়।

সুতরাং বিজয়া দশমী শুধু দেবী দুর্গার মহিমা স্মরণ করার দিন নয়; এটি নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নবায়নেরও উপলক্ষ হতে পারে।

বিসর্জনের দর্শন: অনিত্যতা, আত্মশুদ্ধি ও নতুন সূচনা

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে নিহিত রয়েছে জীবনের অনিত্যতার এক গভীর দার্শনিক শিক্ষা। মানুষ জীবনে নানা সম্পর্ক, সম্পদ, সাফল্য, আনন্দ ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটে। কোনো অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। এই সত্য উপলব্ধি করা মানে জীবনের আনন্দকে অস্বীকার করা নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য উপলব্ধি করা এবং পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখা।

মাটির প্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে একটি রূপ সৃষ্টি হয়, পূজার মাধ্যমে সেই রূপ ভক্তি ও আবেগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, আর বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার দৃশ্যমান উপস্থিতির অবসান ঘটে। কিন্তু প্রতিমার সঙ্গে যুক্ত স্মৃতি, প্রার্থনা, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যায়। এই প্রক্রিয়া আমাদের বোঝায় যে কোনো কিছুর বাহ্যিক রূপ বিলীন হলেও তার মানসিক, সাংস্কৃতিক বা আত্মিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বিজয়া দশমী আত্মশুদ্ধির কথাও মনে করিয়ে দেয়। দুর্গাপূজার কয়েক দিন ধরে মানুষ যে ভক্তি, সংযম, উদারতা ও মঙ্গলকামনার চর্চা করে, তা যদি দৈনন্দিন জীবনে ধরে রাখতে পারে, তবেই উৎসবের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হয়। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ, অহংকার, হিংসা, অসততা ও অন্যায় পরিহার করে সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের পথে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে বিজয়ার প্রকৃত অঙ্গীকার।

বিসর্জন তাই সমাপ্তির পাশাপাশি নতুন সূচনার প্রতীক। একটি উৎসব শেষ হয়, কিন্তু তার শিক্ষা নতুন করে জীবনকে পরিচালিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

আধুনিক জীবনে বিজয়া দশমীর প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক জীবন দ্রুতগতির, প্রতিযোগিতামূলক এবং নানা ধরনের অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক দূরত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের কারণে মানুষের মধ্যে অনেক সময় আন্তরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিজয়া দশমীর মতো উৎসব মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, পারিবারিক মিলন এবং সামাজিক বন্ধন পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করে।

বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে কারও বাড়িতে যাওয়া, প্রবীণদের আশীর্বাদ গ্রহণ, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা কিংবা দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকা মানুষের খোঁজ নেওয়া—এসব ছোট কাজও সম্পর্ককে নতুন করে জীবন্ত করে তুলতে পারে। উৎসব মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভালো সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও জীবনের গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিজয়া দশমীর ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশু-কিশোরদের দর্পণ বিসর্জন, সিঁদুর খেলা, প্রতিমা নিরঞ্জন এবং বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের তাৎপর্য বোঝানো হলে তারা শুধু আচার অনুসরণ করবে না; বরং ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত মানবিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কেও জানতে পারবে।

একই সঙ্গে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে পরিবেশ সংরক্ষণ, জননিরাপত্তা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলোও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তবেই বিজয়া দশমী অতীতের ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের দায়িত্বের মধ্যে একটি অর্থবহ সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারবে।

উপসংহার: বিদায়ের অশ্রুতে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি

বিজয়া দশমী বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মানবিক আবেগের এক অনন্য সম্মিলন। দেবী দুর্গার আগমন যেমন আনন্দ ও আশার বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি তাঁর বিদায় মানুষের মনে বিচ্ছেদের বেদনা সৃষ্টি করে। দর্পণ বিসর্জনের শাস্ত্রীয় আচার, সিঁদুর খেলার আনন্দ, ঢাকের বাদ্যে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা এবং পরিশেষে প্রণাম, কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখ—সবকিছু মিলিয়ে বিজয়া দশমী হয়ে ওঠে আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক পূর্ণাঙ্গ উৎসব।

প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে ভক্তরা যে দেবীকে বিদায় জানান, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস কিন্তু বিসর্জনের জলে বিলীন হয়ে যায় না। বরং সেই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে থেকে যায় শক্তি, সাহস, ন্যায় এবং মঙ্গলকামনার প্রেরণা হয়ে। দেবীর বিদায় আমাদের শেখায় যে জীবনের আনন্দ ও বিচ্ছেদ পরস্পরের পরিপূরক; কোনো সমাপ্তিই সব সম্ভাবনার অবসান নয়। প্রতিটি বিদায়ের মধ্যেই নতুন করে শুরু করার একটি সুযোগ লুকিয়ে থাকে।

দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের কাহিনি আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, দুর্বল মানুষের পাশে থাকতে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। বিজয়া দশমীর প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন পূজামণ্ডপের ভক্তি ও উৎসবের আনন্দ আমাদের দৈনন্দিন আচরণে মানবিকতা, সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের রূপ নেয়। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, নারীর মর্যাদা, সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এই উৎসবের অন্তর্নিহিত আদর্শ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

বিসর্জনের সময় নদীর জলে প্রতিমা ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হয়, কিন্তু মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে সেই চিরপরিচিত প্রত্যাশা—‘আসছে বছর আবার হবে’। এই উচ্চারণে মিশে থাকে আজকের বিদায়ের বেদনা, আগামী দিনের আনন্দ এবং অনন্ত আশাবাদ। দেবী দুর্গার কাছে ভক্তদের প্রার্থনা—অশুভ ও অন্যায়ের অবসান ঘটুক, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হোক, মানুষের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসুক, এবং পৃথিবী হয়ে উঠুক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির আবাস।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ অতিক্রম করে মানুষে মানুষে গড়ে উঠুক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার বন্ধন। প্রত্যেক মানুষ যেন নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং স্বাধীনভাবে নিজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি পালন করতে পারেন। এই হোক বিজয়া দশমীর চিরন্তন শিক্ষা, এই হোক শারদীয় দুর্গোৎসবের মানবিক অঙ্গীকার।

দেবী দুর্গার আশীর্বাদে সবার জীবন ভরে উঠুক সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধিতে। বিদায়ের অশ্রু মুছে হৃদয়ে জেগে উঠুক নতুন আশার আলো।

শুভ বিজয়া। আসছে বছর আবার হবে—নতুন আনন্দে, নতুন প্রত্যাশায়, নতুন উদ্দীপনায়

লেখক:প্রদীপ কুমার জয়ধর

এই শাখার আরও খবর

ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা

ইরানে আবারও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ…

যুদ্ধ এড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল পাকিস্তান ও কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে…

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

ধামরাইয়ের ৫২০ কেজির অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা, হবে না বিসর্জন

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ৫২০ কেজি ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার পূজা চলছে। আগামীকাল বুধবার পূজা শেষে এটি দেওয়া হবে না বিসর্জন। এটিই এখানকার রীতি।…

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au