সুইটির ছবি নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। ছবি : সংগৃহীত
‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের জন্য এভাবেই বিলাপ করছিলেন মা জহুরা বেগম। মেয়ের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না তিনি। শেষবারের মতো মেয়ের মুখটা দেখতে চান। কিন্তু সেই সুযোগও পাবেন কি না, তা জানেন না।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছিল সুইটি আক্তারের। তবে সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। পরে পরিবারের চাপে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। কিন্তু সেই স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। একপর্যায়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ আর বাবার সংসারের অভাব দূর করার চিন্তা থেকে নিজেই বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুইটি।
তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান সুইটি আক্তার। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন তিনি। পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে তাঁর সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন নারী অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছিলেন। এ ঘটনায় তাঁদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কারাগারে থাকলেও মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সুইটির। ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন তিনি। কোনো কারণে যোগাযোগ করতে না পারলে দুশ্চিন্তা না করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে কথা হয় তাঁর। তখনো পরিবারের কেউ ভাবতে পারেননি, সেটিই হতে যাচ্ছে সুইটির সঙ্গে তাঁদের শেষ কথোপকথন।
এর দুই দিন পর সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পান তাঁর মা-বাবা। সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত ১৪ অক্টোবর এ তথ্য জানায় সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।
মেয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে ভেঙে পড়েছেন মা জহুরা বেগম। মেয়েকে আর কোনো দিন দেখতে পাবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাঁর একটাই আকুতি—মেয়ের লাশ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে সুইটি আক্তারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে কথা বলছেন। তাঁদের কেউ সুইটির স্বজন, কেউ প্রতিবেশী। বাড়ির বারান্দায় বসে ছিলেন তাঁর মা-বাবা। মেয়েকে হারানোর শোকে তাঁদের চোখেমুখে ছিল গভীর বিষাদের ছাপ।
মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জহুরা বেগম। কোনো রকমে নিজেকে সামলে তিনি বলেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে।’ এরপর আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শোকে কাতর এই মায়ের কাছে মেয়ের মৃত্যুর খবর যেন কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে না।
কান্নার কারণে একপর্যায়ে কথাও বলতে পারছিলেন না জহুরা বেগম। বুকভরা কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘মা, তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না।’ মেয়ের কষ্টের কথা জানতে না পারার আক্ষেপ তাঁকে বারবার তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’
মেয়েকে হারানোর শোকের পাশাপাশি তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্বজনেরা। জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমানো সুইটির জীবনের শেষ পরিণতি এভাবে হবে, তা কল্পনাও করেননি তাঁরা। যে মেয়েটি পরিবারের অভাব দূর করতে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর খবরে এখন শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি তাঁরা জেনেছেন। তবে সুইটির পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুইটির মা-বাবার এখন একটাই চাওয়া—মেয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। জীবিত মেয়েকে আর ফিরে পাওয়ার কোনো আশা নেই তাঁদের। তবু শেষবারের মতো মেয়ের মুখ দেখে বিদায় জানাতে চান তাঁরা।