‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয়’, মৃত্যুদণ্ডের আগে নজরুলের সেই আক্ষেপ
পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নজরুল ইসলাম মাহিন। কিন্তু পরিবারের দুশ্চিন্তা দূর করার স্বপ্ন নিয়ে…
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সাইবার হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত জাতীয় শিশু সহায়তা কেন্দ্রের (১০৯৮) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে শিশুদের সাইবার হয়রানিসংক্রান্ত ফোনকলের সংখ্যা ৪২ শতাংশ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের অপব্যবহারের কারণে শিশুরা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের হাতে সহজে মুঠোফোন পৌঁছে যাওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের অসচেতনতা ও অনলাইন কার্যক্রমের যথাযথ তদারকির অভাব এ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে শিশুদের ছবি বিকৃত করে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তৈরির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় শিশু সহায়তা কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কেন্দ্রটিতে মোট ৭ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬১টি ফোনকল আসে। এর মধ্যে ৫৯৭টি ছিল শিশুদের সাইবার হয়রানিসংক্রান্ত। এসব ঘটনার মধ্যে ১৭৯টিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে কেন্দ্রটিতে আসা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৯৫৪টি ফোনকলের মধ্যে ৫৬৫টি ছিল সাইবার হয়রানিসংক্রান্ত। এসব ঘটনায় ১৭০টি ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হেল্পলাইনের তথ্য বলছে, গত বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি সাইবার হয়রানিসংক্রান্ত ফোনকল এলেও চলতি বছর সেই সংখ্যা বেড়ে ৭০টির বেশি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হেল্পলাইনে জানানো ঘটনার বাইরেও অনেক শিশু অনলাইন হয়রানির শিকার হচ্ছে, যেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে না।
ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব, পরে ব্ল্যাকমেলের শিকার শিশু
শিশুদের অনলাইন ঝুঁকির একটি ভয়াবহ উদাহরণ তুলে ধরেছেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, করোনাকালে ২০২০ সালে অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ের বয়স বাড়িয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন। পরে ওই অ্যাকাউন্টে সমবয়সী পরিচয় দেওয়া এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে মেয়ের বন্ধুত্ব হয়। একপর্যায়ে কৌশলে পাসওয়ার্ড জেনে ওই ব্যক্তি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এরপর মেয়েটির আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করেন।
ভয়ে মেয়েটি প্রথমে পরিবারের কাউকে কিছু জানায়নি। একপর্যায়ে তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং পড়াশোনাও ব্যাহত হয়। পরে দীর্ঘদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও কাউন্সেলিং নেওয়ার পর সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করে এবং মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তবে এখনো মাঝেমধ্যে পুরোনো ঘটনার মানসিক আঘাত ফিরে আসে।
জাতীয় শিশু সহায়তা কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরিবর্তে শিশুরা অনেক সময় অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সংস্পর্শে আসছে। কিন্তু কে প্রকৃত পরিচয়ে যোগাযোগ করছে আর কে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছে, তা বোঝার সক্ষমতা তাদের সব সময় থাকে না। অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে সমবয়সী পরিচয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য সংগ্রহ করে পরে সেগুলো দিয়ে ভয় দেখায় ও ব্ল্যাকমেল করে।
তাঁর মতে, সন্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার পর অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে কারা তার বন্ধু হচ্ছে, কী ধরনের বার্তা আসছে এবং কেউ ব্যক্তিগত তথ্য চাইছে কি না।
বয়স বাড়িয়ে অ্যাকাউন্ট খোলায় বাড়ছে বিপদের আশঙ্কা
ফেসবুক ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি নেই। তবে অনেক অভিভাবক কিংবা শিশু নিজেরাই বয়স বাড়িয়ে অ্যাকাউন্ট খুলছে। এর মাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা কখনো কখনো গুরুতর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্প্রতি কুমিল্লার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া তিন শিশু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া আরেক শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল। পরে তাদের হবিগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়। কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর ক্ষেত্রেও অনলাইনে এক তরুণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর কক্সবাজারে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। বাড়ি ফেরার পথে ওই ছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। তাঁর অভিযোগ, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। ফলে শিশুরা কার্টুন দেখার সময় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার সময়ও অনুপযুক্ত বা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারে।
সংগঠনটির ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে ১০০টি পরিবারের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ৯৫ শতাংশ মুঠোফোনে আসক্ত। এই বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্টুন ও ভিডিও গেম দেখে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ টিকটক দেখে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ২০১৯ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশের পরিচালিত এক জরিপে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ২৮১ শিশুর মধ্যে ৩২ শতাংশ অনলাইনে সাইবার বুলিং, সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিল। জরিপে অংশ নেওয়া ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশের কথা জানায়। এ ছাড়া ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করার কথা জানিয়েছিল।
এআই দিয়ে ছবি বিকৃত করার ঝুঁকি
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সাধারণ পারিবারিক ছবিও এআই ব্যবহার করে যৌন নিপীড়নমূলক ছবি বা ভিডিওতে রূপান্তর করা হচ্ছে।
তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের তথ্য উল্লেখ করে জানান, ২০২৫ সালে সংস্থাটি এ ধরনের ৩ হাজার ৪৪০টি ভিডিও শনাক্ত করেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩টি। তাঁর মতে, অভিভাবকদের বুঝতে হবে, শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনের কোনো উপকরণ নয়। তাই অপ্রয়োজনে শিশুর নামে প্রকাশ্য অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তার ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, শুধু সন্তানের মুঠোফোন পরীক্ষা করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রাখলেই অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্ব, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি এবং হয়রানির শিকার হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অনলাইনে কোনো ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার হলে সংশ্লিষ্ট লিংক, ব্যবহারকারীর নাম, বার্তা, ঘটনার সময়, স্ক্রিনশট ও মূল ফাইল সংরক্ষণ করা উচিত। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। প্রমাণ সংরক্ষণ না করে তাড়াহুড়ো করে সবকিছু মুছে ফেললে পরবর্তী সময়ে তদন্তে সমস্যা হতে পারে।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব বিশেষজ্ঞদের
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত রাখা, অনুসারীদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করা, শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রাখা জরুরি। শিশুদের বোঝাতে হবে, অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো লিংকে প্রবেশ করা, উপহার দেওয়ার প্রলোভনে সাড়া দেওয়া, গোপনে কথোপকথন চালানো কিংবা ব্যক্তিগত ছবি পাঠানোর অনুরোধে সাড়া দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
শিশুদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যাতে অনলাইনে কেউ ভয় দেখালে, ব্ল্যাকমেল করলে বা অস্বস্তিকর আচরণ করলে তারা নির্ভয়ে অভিভাবককে জানাতে পারে। এ ক্ষেত্রে দোষারোপ না করে শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটালি রাইট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা, অভিভাবকদের দায়িত্বশীল তদারকি এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকর ভূমিকা। পাশাপাশি শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত সাইবার অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, স্কুলপর্যায় থেকেই পাঠ্যক্রমে অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিশুদের সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au