মতামত

“আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর”: শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে এক নেত্রীর বেদনা, বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার

মতামত:অধ্যাপক ড. শ্যামল দাস

  • 12:58 pm - October 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭২ বার
“আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর”: শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে এক নেত্রীর বেদনা, বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলোকে শুধু রাজনীতির ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। সেখানে ইতিহাস এসে মিশে যায় ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে, রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে মিশে যায় মানুষের হারানোর বেদনা। সাংবাদিক সুলতানা রহমানের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের একটি মুহূর্ত আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। যে নারী দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন, যাঁর শাসনামলে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দারিদ্র্য হ্রাসের মতো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে, সেই নারী আজ বলছেন, বাংলাদেশে ফিরে তাঁর থাকার মতো ঘর নেই। এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক বৈপরীত্য। যাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্যে, তিনিই আজ নিজের আশ্রয়ের অনিশ্চয়তার কথা বলছেন।

একদিকে একটি দেশের উন্নয়নের ইতিহাসে তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, অন্যদিকে নিজের পারিবারিক বাড়িঘর হারানোর অভিজ্ঞতা। একদিকে ক্ষমতার দীর্ঘ অধ্যায়, অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুতির পর ব্যক্তিগত অনিশ্চয়তা। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। তাঁর পরিবারের অন্য বাড়িটিও ক্ষতিগ্রস্ত ও বসবাসের অনুপযোগী। দেশে ফিরে কোথায় থাকবেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও তাঁর কাছে নেই। অথচ এই ৩২ নম্বর বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি।

এই বাড়ির ধ্বংস তাই কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি হারানোর ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামনে জাতীয় স্মৃতি, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং রাজনৈতিক সংঘাতের সীমা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা যখন তাঁর বাড়িঘর হারানোর কথা বলেন, তখন তিনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি ১৯৭৫ সালে বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারিয়েছেন এবং বহু দশক পরে আবার তাঁর পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনার ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেছেন। এই ব্যক্তিগত ইতিহাস তাঁর বক্তব্যে একটি স্বতন্ত্র আবেগগত মাত্রা যোগ করেছে।

তবে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের উন্নয়নমূলক অর্জন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত অভিযোগ—সবই ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের অংশ। ব্যক্তিগত বেদনা এসব প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে না; আবার রাজনৈতিক সমালোচনাও ব্যক্তিগত ক্ষতির মানবিক গুরুত্বকে মুছে দেয় না। সুলতানা রহমানের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার তাই কেবল দেশে ফেরার ঘোষণা নয়। এটি স্মৃতি, ক্ষমতা, হারানো, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক দীর্ঘ কথোপকথন। আমি নেত্রীর সাক্ষাতকারের গুরুত্ত্বপূর্ন অংশগুলোর সাথে প্রয়োজনীয় প্রামানিক তথ্য যোগ করে তাঁর অবস্থানের যৌক্তিক ভিত্তি দেয়ার চেষ্টা করেছি।

“আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর”: একটি বাক্যের ভেতর ব্যক্তিগত বেদনা ও ইতিহাস

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে সুলতানা রহমান জানতে চান, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে কোথায় থাকবেন—ঢাকায়, নাকি টুঙ্গিপাড়ায়? উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, রাজধানী ঢাকায় তাঁকে যেতে হবে, কিন্তু কোথায় থাকবেন, তা তিনি জানেন না। তাঁর ভাষায়, পরিবারের বাড়িঘর আর বসবাসের উপযোগী নেই। এরপর তিনি উচ্চারণ করেন সেই কথাগুলো: “আকাশ আমার ছাদ হবে, মাটি আমার ঘর হবে।” মাত্র কয়েকটি শব্দের মধ্যে কতটা ব্যক্তিগত বেদনা, কতটা অনিশ্চয়তা এবং কতটা ইতিহাস জমে আছে, তা বোঝার জন্য তাঁর জীবনের ঘটনাগুলোর দিকে তাকাতে হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে, তিন ভাইসহ পরিবারের বহু সদস্যকে। বিদেশে অবস্থান করায় তিনি এবং তাঁর বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। সেই ট্র্যাজেডির পর তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত ক্ষতি ও জাতীয় রাজনীতির এক জটিল সম্পর্কের মধ্যে। আজ, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে, যখন তিনি বলেন তাঁর থাকার ঘর নেই, তখন সেই কথায় ১৯৭৫ সালের স্মৃতিও ফিরে আসে। একজন মানুষ বাড়ি হারালে শুধু ইট, কাঠ, দরজা কিংবা জানালা হারান না; হারান জীবনের বহু মুহূর্তের আশ্রয়, পরিচিত উঠান, পরিবারের স্মৃতি এবং প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো সময়ের চিহ্ন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটির ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল জাতীয় ইতিহাসও। এই কারণেই বাড়িটির ধ্বংস নিয়ে আলোচনা শুধু রাজনৈতিক সমর্থন বা বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। একটি সমাজ তার অতীতের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, সেই প্রশ্নও এখানে জড়িত। ইতিহাসের সঙ্গে দ্বিমত করা যায়, ঐতিহাসিক নেতার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যায়, তাঁর শাসন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কঠোর মূল্যায়নও করা যায়। কিন্তু ইতিহাসের নিদর্শন ধ্বংস করে অতীতের জটিল প্রশ্নগুলোর সমাধান হয় না।

শেখ হাসিনার “আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর” বক্তব্যটিকে তাই একাধিকভাবে পড়া সম্ভব। এটি একজন মানুষের ঘর হারানোর বেদনার প্রকাশ, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার স্মারক। আবার এটি তাঁর নিজের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নির্মাণেরও অংশ—যেখানে তিনি নিজেকে ঘরহারা হলেও দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরছেন। এই বক্তব্যের আবেগগত শক্তি এখানেই। একসময় রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে থাকা একজন মানুষ আজ নিজের ভবিষ্যৎ আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। ক্ষমতার ইতিহাসে এমন পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভাষায় প্রকাশিত হলে তা ইতিহাসকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

তবে তিনি যাদের জন্য ফিরবেন সেই জনমানুষই তাঁর আশ্রয়; সাক্ষাতকারটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সামাজিক মিডিয়ায় মানুষের অনুভূতির প্রকাশ দেখলেই বোঝা যায়, শেখ হাসিনা যাঁদের ঘর-বাড়ীর জন্য কাজ করেছেন দীর্ঘ সময়, তাঁরাই তাঁর ঘর-বাড়ী, তাঁরাই তাঁর আশ্রয়।

“ফিরতে আমাকে হবেই”: অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা একাধিকবার দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত। এখানে তাঁর বক্তব্যের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি ব্যক্তিগত, নিজের দেশ, পরিচিত মানুষ ও রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিজের ভূমিকা পুনরায় প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা। তবে দেশে ফেরার ইচ্ছা এবং বাস্তবে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ এক বিষয় নয়। তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম, নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। একটি গণতান্ত্রিক ও আইনভিত্তিক ব্যবস্থায় এসব প্রশ্নের সমাধান হওয়া উচিত স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, নাগরিক অধিকার এবং ন্যায্য বিচারের নীতির ভিত্তিতে।

প্রতিশোধের প্রশ্নে তাঁর সাধারন বক্তব্য

সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন সুলতানা রহমান জানতে চান, ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে প্রতিশোধ নেবেন কি না। তিনি উত্তর দেন, “প্রতিশোধ নেওয়া তো আমাদের চরিত্র না।” তিনি আরও বলেন, যাঁরা তাঁর বিরোধিতা করেছেন, তাঁরাও বাংলাদেশের নাগরিক। এই বক্তব্যের তাৎপর্য বিচার করতে হলে রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং ন্যায়বিচারের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। তাই রাজনৈতিক পুনর্মিলনের প্রশ্নটি শুধু বক্তব্যের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার প্রয়োজন। একইভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংঘটিত সহিংসতা, হামলা ও নিপীড়নের অভিযোগগুলোরও তদন্ত হওয়া উচিত। কোনো ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের অধিকার তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। সুতরাং প্রতিশোধ না নেওয়ার ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য হলেও এর বাস্তব মূল্যায়ন নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ আচরণ এবং আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তার ওপর। বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো, বিচার প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়; প্রতিশোধ পরিচালিত হয় প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।

 

চব্বিশের আন্দোলনকারীদের প্রতি শেখ হাসিনার পরোক্ষ বার্তা: সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান

সাক্ষাৎকারের একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অংশে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সুলতানা রহমান জানতে চান, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের মধ্যে প্রতিশোধের যে আশঙ্কা রয়েছে, সে সম্পর্কে তাঁর অবস্থান কী। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, আন্দোলনের সময় অনেক তরুণ অপপ্রচার ও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেককে নিজেদের সিদ্ধান্ত নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ দিয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়েছিল—এটি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবার উদ্দেশ্য ও অভিজ্ঞতাকে একইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভুল উপলব্ধি করা এবং অনুশোচনার সুযোগের কথা বলা। তিনি বলেন, “ভুলটা বুঝতে পারো। তাদের ভিতর অনুশোচনা হোক এটাই তাদের শিক্ষা হবে।” সাক্ষাৎকারের পরবর্তী অংশে তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, “আমাদের যারা ছাত্রছাত্রী বা ভুল পথে গেছে তাদের ভিতরে যাদের অনুশোচন হয়েছে তাদের প্রতিশোধের কোন বিষয় না।” এই কথাগুলোকে চব্বিশের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের প্রতি একটি পরোক্ষ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর বক্তব্যে এমন একটি ধারণা উঠে আসে যে, যাঁরা নিজেদের অতীত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছেন, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিশোধকে অপরিহার্য মনে করা হচ্ছে না। যদিও তিনি সরাসরি তাঁদের ফিরে আসাকে স্বাগত জানানোর ঘোষণা দেননি, তাঁর কথায় অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনার গুরুত্ব স্পষ্ট।

এই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে যায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাঁদের ‘লাল বদর’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার ও সংলাপের বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের একাংশের সমালোচনার কথা সামনে এসেছে। এই বিতর্কের মধ্যে তাঁর বক্তব্যকে আমি কিছুটা ভিন্নভাবে দেখি। আমার ব্যাখ্যায়, তিনি হয়তো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছেন; অতীতে কে কোন অবস্থানে ছিলেন, সেটিই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। কেউ যদি নিজের পূর্ববর্তী অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে চান, তাহলে তাঁর সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি শেখ হাসিনার সরাসরি ঘোষণা নয়; বরং তাঁর প্রতিশোধবিরোধী বক্তব্য থেকে আমার উপলব্ধি।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই অবস্থানকে Political Reconciliation বা রাজনৈতিক পুনর্মিলনের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যায়। রাজনৈতিক সংঘাতের পর একটি সমাজে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা প্রতিপক্ষের পরাজয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক অবিশ্বাস কমানো, অতীতের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্‌ঘাটন এবং ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষের মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা। শেখ হাসিনার বক্তব্যে সেই সম্ভাবনার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশেষত তিনি যখন বলেন, তাঁর বিরোধিতাকারীরাও বাংলাদেশের নাগরিক, তখন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে অভিন্ন নাগরিক পরিচয়ের বিষয়টি সামনে আসে।

আমার কাছে এই সাক্ষাৎকারের একটি সম্ভাব্য অন্তর্নিহিত বার্তা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় অতীতের রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করার পরিবর্তে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র খুঁজে দেখা জরুরি। এর অর্থ অতীতের অন্যায় ভুলে যাওয়া বা অপরাধের দায় থেকে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া নয়। বরং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পাশাপাশি রাজনৈতিক মতপরিবর্তনের স্বাধীনতা এবং সহযোগিতার সুযোগও থাকা উচিত। কে একসময় কার বিরোধিতা করেছিলেন, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি এখন কে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধ রক্ষায় কী ভূমিকা রাখতে চান—সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্লেষণে, শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিভাজনের পরিবর্তে বৃহত্তর রাজনৈতিক সহাবস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

উন্নয়নের স্মৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা: অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থার আশঙ্কা

শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব অর্জনের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের দারিদ্র্য মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৩৭.১ শতাংশ থেকে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছিল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নপ্রক্রিয়ার অংশ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সম্প্রসারণও সেই উন্নয়নযাত্রার দৃশ্যমান নিদর্শন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ৩.২ শতাংশে, যেখানে একই অর্থবছরের জন্য জানুয়ারিতে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪.৭ শতাংশ। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে IMF আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংকও একই অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ করেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতার ইঙ্গিত নয়; এগুলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিনিয়োগের দুর্বলতা। IMF-এর জানুয়ারি ২০২৬-এর অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপির ২৮.৫ শতাংশ থেকে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ২৩ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কথা উঠে এসেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.৪৯ শতাংশ। গ্যাস ও জ্বালানির সংকট, উচ্চ সুদহার এবং ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়ন প্রকল্পের গতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অবশ্য বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে দেশে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই হচ্ছে না; বরং সামগ্রিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে Counterpoint-এ প্রকাশিত তাঁর “A State of Economic Emergency” শিরোনামের প্রবন্ধে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী Stagflation বা স্থবির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সমস্যায় পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, IMF-এর সংশোধিত পূর্বাভাসে ২০২৭–২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, সরকারি রাজস্বের সীমাবদ্ধতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, সংকটকে স্বীকার না করে আশাবাদী বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা যথেষ্ট নয়; বরং ব্যাংক খাতের প্রকৃত ক্ষতির স্বচ্ছ প্রকাশ, কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ বর্তমান বছরে বাংলাদেশ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সব দেশের ওপরে অবস্থান করছে।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিক রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে শুধু জাতীয় আয়ের হিসাব পরিবর্তিত হয় না; এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, পরিবারের ব্যয়ভার এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশার ওপর। বিশেষত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অর্থনৈতিক হতাশা ও সামাজিক অসন্তোষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে অতীতের উন্নয়ন অর্জনের যে স্মৃতিচারণ উঠে এসেছে, তার সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক সূচকগুলোর তুলনা বাংলাদেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।

দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও জননিরাপত্তা: বর্তমান বাংলাদেশের কয়েকটি উদ্বেগজনক সূচক

শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা মূল্যায়ন করতে হলে সাম্প্রতিক দুর্নীতি, অপরাধ ও মানবাধিকার পরিস্থিতির তথ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদিও সাক্ষাৎকারে তিনি এসব সূচকের প্রত্যেকটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেননি, স্বাধীন গবেষণা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ থেকে বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার সামনে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করা যায়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, সরকারি ও অন্যান্য সেবা গ্রহণের সময় ৮১.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় দুর্নীতি ও ঘুষের অভিজ্ঞতার হার বেড়েছে বলেও জরিপে উল্লেখ করা হয়। এই পরিসংখ্যান দেখায়, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সমস্যার স্বয়ংক্রিয় সমাধান হয় না। দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।

অর্থ পাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত টিআইবির একটি মূল্যায়নে ২৪৯ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ এবং আর্থিক অপরাধের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঘোষণা ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য থাকলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে তদন্তাধীন অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। একইভাবে দুর্নীতির সাম্প্রতিক সূচক দিয়ে অতীতের সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগও খারিজ করা যায় না।

জননিরাপত্তার পরিস্থিতিও উদ্বেগের একটি বড় ক্ষেত্র। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (HRSS) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে অন্তত ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে, যাতে অন্তত চারজন নিহত ও ৫২৭ জন আহত হন। একই মাসে গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ৩৫টি ঘটনায় অন্তত নয়জন নিহত হন। এসব পরিসংখ্যান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।

নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান আরও গভীর উদ্বেগের কারণ। HRSS-এর জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য নথিবদ্ধ হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৩৮ জন শিশু ও কিশোরী। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের পৃথক পর্যবেক্ষণে আরও ২৫৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব সংখ্যা সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক নথিবদ্ধ ঘটনার হিসাব; প্রকৃত অপরাধের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা নয়। তবু এগুলো নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।

এখানে একটি সমাজতাত্ত্বিক বিষয় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত সেবা এবং ন্যায়বিচারের অভিজ্ঞতার ওপরও নির্ভর করে। মানুষ যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের কাছে উন্নত নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশা করে, তখন বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই প্রত্যাশার তুলনা শুরু হয়। সমাজবিজ্ঞানে এই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধানকে Relative Deprivation বা আপেক্ষিক বঞ্চনার ধারণা দিয়ে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

তবে এসব সমস্যার উপস্থিতি থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে জনগণ এখন শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের প্রতি ফিরে যাচ্ছে। সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে নির্ভরযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক জনমত জরিপ প্রয়োজন। বরং এই পরিসংখ্যানগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বাংলাদেশের মানুষ যে নিরাপত্তা, সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্র কি তা নিশ্চিত করতে পারছে? এই প্রশ্নটি যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

নির্বাচন, রাজনৈতিক অধিকার ও জনগণের সিদ্ধান্ত

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নির্বাচন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন এবং বলেছেন, কোন দল ক্ষমতায় যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার জনগণের। তাঁর বক্তব্য ছিল, “একটা সুন্দর ইলেকশন দিক, দেখি জনগণ যদি আমাদের চায় আছি, না চাইলে নাই।” তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু দলটিকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন করলে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এখানে তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, কোনো দলের গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।

এই আলোচনার একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে তাঁর দলের আপত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, “যে পদ্ধতিতে হোক নির্বাচন হোক, আমাদের কোনো আপত্তি নেই।” তখন সুলতানা রহমান সরাসরি প্রশ্ন করেন, তাহলে কি বর্তমান সরকারের অধীনেও নির্বাচন হলে তাঁর আপত্তি থাকবে না? শেখ হাসিনা উত্তরে বলেন, “সেটা তখন দেখা যাবে।” এরপর তিনি একটি পাল্টা প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্য, বিএনপি নিজেই অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেছে; তাহলে ক্ষমতায় থেকে নিজেদের সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্নটি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? তাঁর ভাষায়, “এরাই তো বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছে। তাহলে আবার এরা কী করে এ সরকারের অধীনে ইলেকশন করবে, সেটাও তো একটা প্রশ্ন দাঁড়াবে।”

এই কথোপকথনে শেখ হাসিনার অবস্থানের দুটি দিক স্পষ্ট হয়। প্রথমত, তিনি নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিকে আগাম অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেননি। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়েও তিনি চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং বিএনপির পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি এবং বর্তমান অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এটি নির্বাচনের পদ্ধতির পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে একটি বিতর্ক। তবে বিএনপির অতীত ও বর্তমান অবস্থানের মধ্যে প্রকৃত অসংগতি রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের আনুষ্ঠানিক দলীয় বক্তব্য এবং সাংবিধানিক পরিস্থিতিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি হলো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ এবং ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। একটি নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু ভোট গ্রহণের আয়োজন যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ, প্রার্থিতার অধিকার, ভোটারের স্বাধীনতা, নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতাও বিবেচনা করতে হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার এবং গুরুতর অপরাধের অভিযোগের আইনসম্মত বিচার পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই নীতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত নির্বাচনী প্রশ্নগুলোকে তাই শুধু দলীয় প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনী নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

উপসংহার: ঘর হারানোর দীর্ঘশ্বাস এবং ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া

সাক্ষাৎকার শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শেখ হাসিনার কয়েকটি কথা মনে থেকে যায়—দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশোধ না নেওয়ার ঘোষণা, জনগণের কাছে সহযোগিতা ও দোয়া চাওয়া এবং সেই কয়েকটি শব্দ, “আকাশ আমার ছাদ হবে, মাটি আমার ঘর হবে।” এই কথাগুলোর মধ্যে একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের দীর্ঘ যাত্রা যেন সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। ১৯৭৫ সালের পারিবারিক ট্র্যাজেডি, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ২০২৪ সালের ক্ষমতার পরিবর্তন—সবকিছুই তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

ইতিহাসের একটি কঠিন সত্য হলো, রাষ্ট্রক্ষমতা স্থায়ী নয়। রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়, একসময়ের শাসকও অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারেন। এই সাক্ষাৎকার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক ইতিহাস শুধু ক্ষমতার ইতিহাস নয়; এটি মানুষের জীবন, স্মৃতি, ক্ষতি এবং আশা-আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসও। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে মতভেদ থাকবে, তাঁর সরকারের অর্জন নিয়ে আলোচনা হবে, সমালোচনাও হবে। ২০২৪ সালের ঘটনাবলি এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক ও ঐতিহাসিক মূল্যায়নও জরুরি। কিন্তু সেই মূল্যায়ন যেন ইতিহাসের নিদর্শন ধ্বংস, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কিংবা নাগরিক অধিকার অস্বীকারের মাধ্যমে পরিচালিত না হয়।

বর্তমান বাংলাদেশের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্যও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক স্বস্তি কতটা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। যে রাজনৈতিক শক্তিই ক্ষমতায় থাকুক, তার কাছে নাগরিকের প্রত্যাশা এই মৌলিক বিষয়গুলোতে বাস্তব উন্নতি। আর যে রাজনৈতিক শক্তিই বিরোধী অবস্থানে থাকুক, তার অধিকার রক্ষা এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করাও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একটি রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে কীভাবে তার ইতিহাস সংরক্ষণ করে, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দেয় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার নিশ্চিত করে। শেখ হাসিনা দেশে কবে ফিরবেন, কীভাবে ফিরবেন, কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু তাঁর এই সাক্ষাৎকারের শেষভাগে উচ্চারিত কথাগুলো একটি বৃহত্তর মানবিক প্রশ্ন রেখে যায়। একজন মানুষ যখন নিজের জন্মভূমিতে ফিরে এসে মাথা গোঁজার আশ্রয় নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা বলেন, তখন সেই বেদনা কি আমরা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে অনুভব করতে পারি?

হয়তো ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার একটি পরীক্ষাও এখানেই। কারণ ঘর শুধু চার দেয়ালের নাম নয়; ঘর মানে স্মৃতি, ঘর মানে পরিচয়, ঘর মানে ফিরে আসার একটি ঠিকানা। আর যখন সেই ঠিকানাই হারিয়ে যায়, তখন মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এমন একটি বাক্য, যা ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে ইতিহাসের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, “আকাশ আমার ছাদ, মাটি আমার ঘর।”

 

তথ্যসূত্র

১. বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক, সুলতানা রহমানের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার, অক্টোবর ২০২৬: https://www.youtube.com/live/PFOTOqZD7MI

২. World Bank, Bangladesh Poverty and Equity Assessment, 2025।

৩. Transparency International Bangladesh, Corruption in Service Sectors: National Household Survey 2025, প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬।

৪. Transparency International Bangladesh, One and a Half Years after the Fall of Authoritarianism: Expectations and Outcomes, ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

৫. Human Rights Support Society (HRSS), Half-Yearly Human Rights Report, জানুয়ারি–জুন ২০২৬।

৬. Human Rights Support Society (HRSS), Human Rights Situation Report, সেপ্টেম্বর ২০২৬।

৭. Human Rights Support Society (HRSS), Quarterly Human Rights Report, জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬।

 

এই শাখার আরও খবর

শেষ ১০ মিনিটে ৩ গোল, নাটকীয় ম্যাচে হার এড়াল মেসিরা

ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে হলো তিনটি গোল। শেষ মুহূর্তের গোলে হার এড়াল লিওনেল মেসির ইন্টার মায়ামি। বৃহস্পতিবার এফসি সিনসিনাতির বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করেছে দলটি।…

‘ধাক্কাটি ছিল ভয়াবহ, বগিটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে’

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনার ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের যাত্রী ও সাংবাদিক রবার্তো গোমেজ। তাঁর ভাষায়, সংঘর্ষের ধাক্কা ছিল এতটাই তীব্র যে একটি বগি পুরোপুরি…

তদন্তের আগেই দোষারোপ, সংবাদমাধ্যমে প্রচার ও ফেসবুকে উস্কানি

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে কৃপেশ রায় (৪০) নামের এক যুবককে…

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও গোপনে ধারণ করা সেই তাওসিফ সৌরির মরাদেহ উদ্ধার

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও গোপনে ধারণ করা তাহসিফ সৌরি নামে এক সাবেক সামরিক পাইলটের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত…

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ, আজ মধ্যরাত থেকেই নদীতে নামবেন জেলেরা

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা রক্ষা ও মাছের উৎপাদন বাড়াতে সারাদেশের নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ ২৯ অক্টোবর মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞা…

‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্যের জেরে আইজিপিকে সরানোর গুঞ্জন, আলোচনায় পাঁচ কর্মকর্তা

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের মধ্যে পুলিশের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন ছড়িয়েছে। এ ঘটনায় রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক সংগঠন,…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au