কফিনে শায়িত জসিমের মরদেহ ছুঁয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছেন স্বজনেরা। ছবি: সংগৃহীত
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :
পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন চাঁদপুরের জসিম উদ্দিন। স্বপ্ন ছিল, প্রবাসে পরিশ্রম করে স্ত্রী ও তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়বেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে মরুভূমির বালুর নিচে চাপা পড়েছিল তাঁর মরদেহ। দীর্ঘ ৪১ দিন পর অবশেষে দেশে ফিরেছে সেই মরদেহ। তবে স্বজনদের কাছে ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) জসিমের মরদেহ চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ঘাসিরচর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। পরে বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। কফিন বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী ও তিন মেয়ে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
নিহত জসিম উদ্দিন ওই গ্রামের আইয়ুব আলীর ছেলে। সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকার আল গাম্মাসে একটি খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। স্ত্রী রুমা আক্তার ও তিন মেয়ে জাকিয়া, আয়েশা ও জেসিয়াকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রায় চার লাখ টাকা দেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে এক সহকর্মীর সঙ্গে বের হন জসিম। এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সন্ধান পাননি।
কয়েক দিন পর সৌদি আরবের আল কাসিম এলাকার একটি মরুভূমি থেকে বালুচাপা অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, জসিমকে গলাটিপে হত্যার পর মরদেহ বালুর নিচে চাপা দেওয়া হয়েছিল।
আরও অভিযোগ, জসিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে তাঁর স্ত্রী ও স্বজনদের কাছে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ ঘটনায় সাব্বির নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সৌদি পুলিশ। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
জসিমের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছিল পরিবার। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও সহযোগিতার অভাবে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছিল। একপর্যায়ে স্থানীয় সাংবাদিক শামীম মিয়াজীর মাধ্যমে যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মর্তুজা মাহবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাঁরা।
পরে মর্তুজা মাহবুবের সহযোগিতায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতায় অবশেষে জসিমের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়।
জসিমের স্ত্রী রুমা আক্তার স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিন মেয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
জসিমের বড় মেয়ে জাকিয়ার বিয়ে হয়েছে। মেজ মেয়ে আয়েশা ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে জেসিয়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এখন সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন রুমা।
মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তবে স্বজনদের কাছে জসিমের মরদেহ ফিরে এলেও তাঁদের অপেক্ষা এখন হত্যার বিচার এবং তিন মেয়ের নিরাপদ ভবিষ্যতের।