২০ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় কেরেম শালোম ক্রসিংয়ের পথে রাফার মিশরীয় দিক থেকে জ্বালানি ট্যাঙ্কারগুলো পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। ছবি : এএফপি
মেলবোর্ন ২১ অক্টোবর- গাজা উপত্যকার একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রবেশ ও বহির্গমন পথ রাফা ক্রসিং (Rafah Crossing) আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। এই রুটটি ফিলিস্তিনের গাজা অঞ্চলকে মিসরের সঙ্গে যুক্ত করে, যা বহু বছর ধরেই যুদ্ধ, মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর কিছু সময়ের জন্য পথটি খোলা থাকলেও, মিসর ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে আবারও এটি বন্ধ হয়ে গেছে।
গাজার স্থানীয় প্রশাসন ও মিসরের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী রাফা ক্রসিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার পর থেকে এ পথের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। এর ফলে গাজার ভেতরে আটকে পড়েছেন হাজারো রোগী, আহত মানুষ ও বিদেশগামী ফিলিস্তিনি নাগরিক। অন্যদিকে, মিসর সীমান্তেও আটকে আছে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রীবাহী ট্রাক, যা গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না।
একজন মিসরীয় সীমান্ত কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
“ইসরায়েল বর্তমানে রাফা সীমান্তের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মিসরীয় পক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুমতি না মেলে, ততক্ষণ পর্যন্ত এখানে মানবিক সহায়তা বা মানুষ চলাচল সম্ভব নয়।”
ইসরায়েল দাবি করছে, হামাস যোদ্ধারা অতীতে রাফা সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র ও যোদ্ধা পারাপার করত। তাই “নিরাপত্তাজনিত কারণে” তারা ক্রসিংয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রাক বা ব্যক্তি ওই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে না।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুই নিরাপত্তার অজুহাত নয়; বরং গাজা উপত্যকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, মিসর সরকার রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, ক্রসিং খোলা হলে গাজা থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী সিনাই উপত্যকায় প্রবেশ করতে পারে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মিসর বারবার বলেছে, তারা মানবিক সহায়তার ট্রাক প্রবেশে সহায়তা করতে চায়, কিন্তু ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতির মধ্যে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণে অংশ নেবে না।
রাফা ক্রসিং বন্ধ থাকায় গাজার ভেতরে মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
হাজার হাজার আহত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য মিসর বা অন্য দেশে যেতে পারছেন না।ওষুধ, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশের অনুমতি পেলেও এখন তা ৫০টিরও কম, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা (OCHA) এক বিবৃতিতে বলেছে,
“রাফা ক্রসিং বন্ধ থাকায় গাজা কার্যত একটি ‘খোলা কারাগারে’ পরিণত হয়েছে।”
বর্তমানে মিসর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করে সীমান্তটি পুনরায় খোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। কূটনীতিক সূত্র জানিয়েছে, আলোচনায় “যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা” চালুর বিষয়টি বিবেচনায় আছে, যাতে মানবিক ত্রাণ চলাচল ইসরায়েলি নজরদারির মধ্যেই হলেও অব্যাহত রাখা যায়।
রাফা ক্রসিং কেবল একটি সীমান্ত নয়, বরং গাজার মানুষের জীবনরেখা।
এটি বন্ধ থাকা মানে-
চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তার প্রবাহ বন্ধ,হাজারো মানুষের জীবন হুমকিতে,এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন।
বর্তমানে সবাই আশা করছে, আন্তর্জাতিক চাপে ও কূটনৈতিক সমঝোতায় শিগগিরই এই পথটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে যাতে অন্তত মানবিক সহায়তা ও আহতদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।