সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ জুলাই- একটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায় কী? নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা দেওয়া। সীমান্ত পাহারা দেওয়া। ভেতরের শান্তি রক্ষা করা।
কিন্তু গত ২৩ মাসে প্রশ্ন উঠেছে – জাতীয় নিরাপত্তা আজ কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রাম আবারও আলোচনায়। এবার নতুন নাম খুমি পিপলস ফোর্স বা কেপিএফ।
বিভিন্ন সূত্রে দাবি, কেপিএফ সদস্যরা মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বান্দরবানের রুমা-থানচি, রাঙামাটির বিলাইছড়ি, খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকায় তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এমনকি বিজিবির কাছে সীমান্তে “অবাধ চলাচলের” অনুমতি চাওয়ার বার্তার কথাও শোনা যাচ্ছে।
পাহাড়ে কুকি-চিন, ইউপিডিএফ, জেএসএস, আরাকান আর্মির পুরনো ইতিহাস আছে। অপহরণ, মুক্তিপণ, পর্যটক জিম্মি – এসব নতুন না। কেপিএফকে ঘিরে সেই পুরনো ভয় আবার ফিরেছে। বর্ষায় রুমা-থানচির ট্রেইল বন্ধ। স্থানীয় ব্যবসা, পর্যটন ধসে পড়েছে।
সীমান্তে ফাঁক মানেই দেশের ভেতরে বিপদ। রাষ্ট্রের উচিত এখনই কঠোর নজরদারি।
সীমান্তের বাইরে যা, ভেতরে তার চেয়ে গভীর।
আইএস, হিজবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম – নামগুলো মাঝে মাঝেই খবরে আসে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বাংলাদেশ নিয়ে উগ্রবাদ-সংক্রান্ত রিপোর্ট হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ: পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, তুরস্ক, রাশিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। কারা পাঠাচ্ছে, কোন নেটওয়ার্ক কাজ করছে – এই উত্তর নাই। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়েও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
উগ্রবাদী মতাদর্শ সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। অনলাইনে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে – সবখানে এর শিকড়।
৫ আগস্টের পর উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
উল্টো অভিযোগ উঠেছে – স্বাধীনতাবিরোধী এবং জঙ্গিবাদে মদদদাতা হিসেবে পরিচিত কিছু গোষ্ঠীকে রাজনীতির মাঠে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আবার স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।
সংসদে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তাচ্ছিল্য। জুলাই-আগস্টের ঘটনায় জড়িতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার চেষ্টা।
রাষ্ট্র যখন উগ্রবাদকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে, তখন সেই উগ্রবাদই একদিন রাষ্ট্রকে গ্রাস করে।
জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ কোনো দেশ, সমাজ বা ধর্মের জন্য কল্যাণকর না। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান তার প্রমাণ।
একসময় “কৌশলগত কারণে” জঙ্গিদের ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলাফল: স্কুলে হামলা, বাজারে বোমা, অর্থনীতি ধ্বংস, আন্তর্জাতিক একঘরে।
বিশ্লেষকরা এখনই বলছেন – উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ না করলে বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটবে। তখন বিনিয়োগ আসবে না, পর্যটন থাকবে না, ২০ লক্ষ তরুণের মতো আরও অনেকে দেশ ছাড়বে।
জাতীয় নিরাপত্তা ফেরাতে এখনই ৪টি কাজ জরুরি:
বিজিবি-সেনা-গোয়েন্দার সমন্বয়। ড্রোন, সিসিটিভি, নতুন ফাঁড়ি। কেপিএফ বা যে-ই হোক, অনুপ্রবেশ মানেই কঠোর ব্যবস্থা।
শুধু গ্রেফতার না। স্কুল-কলেজ-মসজিদ-মিডিয়ায় সম্প্রীতির কথা। পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ফেরানো।
মব না, আদালত। অপরাধী যেই হোক শাস্তি। দ্বিমুখী নীতি বন্ধ।
দেশ সবার। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ খেলা বন্ধ করে সবাইকে নিয়ে চলতে হবে।
সীমান্তে আজ যে আগুন, কাল তা ঢাকায় আসবে। ভেতরে আজ যে উগ্র বয়ান, কাল তা ক্ষমতা চাইবে।
“জাতীয় নিরাপত্তা আজ কোথায়?” – এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। নইলে ইতিহাস লিখবে – “একটা জাতি নিজের নিরাপত্তার দায় নিজেই ছেড়ে দিয়েছিল।”
সময় আছে। কিন্তু বেশি না।