অস্ট্রেলিয়ায় আগামী সপ্তাহে আবারও সুদের হার বাড়ানোর জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার (আরবিএ) গভর্নর মিশেল বুলকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কবার্তাই বেশি ভাবিয়ে তুলেছে তাঁদের। কারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটছে, তখন অতিরিক্ত কড়াকড়ির ফলে অর্থনীতি মন্দার দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি জোরদার করছে। তবে সুদের হার বাড়াতে বাড়াতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম অতিরিক্ত শ্লথ হয়ে পড়লে তার পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বুধবার নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউজিল্যান্ড (আরবিএনজেড) সুদের হার ২ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখে। দেশটিতে সুদের হার অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক কম। অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে এই হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের ভাষ্য, ‘বিশ্ব অর্থনীতি হঠাৎ করেই মন্দার দিকে মোড় নিতে পারে, যার ফলে মধ্যমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসবে।’
পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আগামী ছয় সপ্তাহকে গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেছে ব্যাংকটি। তাদের মতে, ‘আগামী ছয় সপ্তাহে পাওয়া নতুন তথ্য সুদের হার নিয়ে আমাদের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।’
বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানির দাম নতুন করে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের জোয়ার শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা
স্বল্পমেয়াদে অস্ট্রেলিয়ায় সুদের হার আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছে বাজার। আরবিএর পরবর্তী বৈঠকের পর সুদের হার ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে বাজারে ৮২ শতাংশ সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বৈঠকটি মেলবোর্ন কাপের দিন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
ওয়েস্টপ্যাক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ লুসি এলিসের ধারণা, বেকারত্ব বাড়া ও বাড়ির দাম কমার উদ্বেগ সত্ত্বেও আরবিএ আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে। এতে বাড়ির ঋণগ্রহীতাদের ওপর কিস্তির চাপ আরও বাড়বে।
এলিস বিশেষভাবে নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আকস্মিক বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি নিয়ে দেওয়া সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘এটি ছয় সপ্তাহের মধ্যে ঘটুক বা আরও দীর্ঘ সময় নিয়ে ঘটুক, এমন সম্ভাবনা আরবিএর বিবেচনায় রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, তাঁরাও আপাতত এমন পরিস্থিতিকে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে দেখছেন না। যদিও এআই খাতে বিনিয়োগের অর্থায়ন হঠাৎ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রার ওপরে
অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। আরবিএর গভর্নর মিশেল বুলক ও তাঁর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সিনেটের বাজেটবিষয়ক শুনানিতে প্রশ্নের মুখে পড়ার সময় প্রকাশিত নতুন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পছন্দের সূচক ‘ট্রিমড মিন’ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত মার্চের পর সর্বোচ্চ।
আরবিএর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে রাখা উচিত।
বুধবার শুনানিতে বুলক বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন শুধু আমরাই নই। অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও নীতিগত সুদের হার বাড়াচ্ছে, অথবা প্রয়োজন হলে বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু জ্বালানির দাম কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তৈরি হয়নি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিশেষ করে সরকারি ব্যয়ও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
আবাসন ও কর্মসংস্থান নিয়ে কী বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?
অস্ট্রেলিয়ার আবাসন ও শ্রমবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন বুলক। তাঁর মতে, বেকারত্বের হার আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
বাড়ির দাম কমলেও ২০২০ সালের শুরুর তুলনায় তা এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রয়েছে বলে জানান তিনি।
আরবিএর ডেপুটি গভর্নর সারাহ হান্টারও অর্থনীতি মন্দার দিকে যাচ্ছে, এমন আশঙ্কা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কোনো সূচকই ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে অর্থনীতি নিকট ভবিষ্যতে মন্দায় রয়েছে বা মন্দার দিকে এগোচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, পূর্বাভাসের সময়সীমায় অর্থনীতির এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে তাঁরা মনে করছেন না।

সিনেটের বাজেটবিষয়ক শুনানিতে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে অংশ নেন অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার (আরবিএ) গভর্নর মিশেল বুলক ও ব্যাংকটির প্রতিনিধিরা। ছবি: অ্যালেক্স এলিংহাউসেন
পঞ্চমবার সুদের হার বাড়ালে আরবিএর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে?
এএমপি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ মাই বুই ও উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ানা মুসিনা মনে করেন, চলতি বছরে পঞ্চমবারের মতো সুদের হার না বাড়ালে আরবিএর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, সুদের হার আরও বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা যথেষ্ট হবে কি না।
তাঁদের ভাষ্য, অর্থনীতি শ্লথ হওয়ার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি কম থাকতে পারে বলে তাঁরা ধারণা করছেন। তবে তাঁদের আশা, অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দায় না গিয়েই মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে।
মূল্যস্ফীতি স্থায়ীভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে থেকে গেলে তা অর্থনীতিতে স্থায়ী প্রবণতায় পরিণত হতে পারে। এ পরিস্থিতিকে ‘এনট্রেঞ্চড ইনফ্লেশন’ বলা হয়। আরবিএ এমন পরিস্থিতি এড়াতে চায়, যেখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতিকেই নতুন স্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে ধরে নেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর অ্যান্ড্রু হাউজার বলেন, কিছু কোম্পানি হয়তো ভাবতে শুরু করেছে যে পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে আর ফিরবে না। ফলে ভবিষ্যতে মূল্য নির্ধারণের সময় তাদের এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি এখনই বড় কোনো সতর্কসংকেত নয়, কিংবা আমার সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নও নয়। তবে বিষয়টি আমরা খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
এআই খাতের বিনিয়োগ কি নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে?
বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে। তবে এ বিনিয়োগ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সংকটেরও কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো তৈরিতে চাহিদা বাড়ায় প্রযুক্তিপণ্যের কিছু যন্ত্রাংশের দামও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে এ খাতে বিনিয়োগের জন্য বিপুল ঋণ নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যাশিত আয় বা মুনাফা না এলে এ ঋণের চাপ আর্থিক বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
বুলক জানান, অস্ট্রেলিয়ায় ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ তাঁদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতিতে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ছে।
আরবিএর সহকারী গভর্নর ব্র্যাড জোনস প্রশ্ন তুলেছেন, এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে বাজারের প্রত্যাশা বাস্তবতার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে কি না।
সিনেটের শুনানিতে তিনি বলেন, এ খাতে অস্বাভাবিক মাত্রার উচ্ছ্বাস রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তবে কোম্পানিগুলোর আয়ের প্রত্যাশা এবং সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য বাড়তে থাকা ঋণের পরিমাণ এ খাতে বিনিয়োগের উচ্ছ্বাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
জোনসের ভাষ্য, এআই-সংশ্লিষ্ট আর্থিক ঝুঁকির কারণে বাজার এখনো সর্বোচ্চ সতর্কতার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। তাই বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন।
নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বলেছে, এআই খাতে বিনিয়োগের সাম্প্রতিক উল্লম্ফন অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও মৌলিক ভিত্তি দিয়ে ন্যায্যতা পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর চাপ রয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত কড়াকড়ি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে মন্দার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের সম্ভাব্য ঝুঁকি যুক্ত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে।
সূত্র:নিউজ.কম.এইউ