গুলিস্তান থেকে ফটোসাংবাদিক বাদল দাস নিখোঁজ, উদ্বিগ্ন সহকর্মীরা
রাজধানীর গুলিস্তান থেকে দৈনিক নবচেতনা পত্রিকার ফটোসাংবাদিক বাদল দাস (৫০) নিখোঁজ হয়েছেন। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর)…
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আপত্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই মিয়ানমারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশটির বৃহত্তর স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন কর্মসূচির প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে মিয়ানমারের সমঝোতার আওতায় ধাপে ধাপে প্রায় ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মালয়েশিয়া বলছে, যারা ফেরত যাচ্ছেন তারা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ফেরত পাঠানোর জন্য মিয়ানমার সরকার ১ হাজার ৪৭৬ জনকে শনাক্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ের ২৭ আগস্টের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, এই প্রত্যাবাসন কর্মসূচি নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুত নৌঘাঁটির কাছে মঞ্জুং পৌরসভার একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহরসহ কয়েক ডজন বাস পৌঁছায়। পরে বাসগুলোকে নৌঘাঁটির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহারের কথা জানিয়েছে মালয়েশিয়া।
স্টেডিয়ামের ভেতরে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে বাসে থাকা ব্যক্তিদের সঠিক পরিচয় এবং তাদের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা ছিলেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষও প্রথম দফায় ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে তিনি ২৭ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতির দিকে গণমাধ্যমকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন।
মিয়ানমার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এর আগে জানিয়েছিল, মালয়েশিয়ায় আটক থাকা ১ হাজার ৪৭৬ জন যাচাই করা নাগরিককে ফেরত নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় চলছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাদের নৌবাহিনীর জাহাজের মাধ্যমে এসব নাগরিককে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
তবে প্রত্যাবাসন কর্মসূচিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মিয়ানমারের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে ব্যাপক সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই এখনো চলছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলেছে, মিয়ানমার এখনো শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে ফেরত যাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এবারের প্রত্যাবাসনে ব্যক্তিদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআর কোনো ভূমিকা রাখেনি।
ইউএনএইচসিআরের অবস্থান অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, অবগত সম্মতির ভিত্তিতে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে হতে হবে। কিন্তু মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে ফেরত যাওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী রয়েছে। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা। দেশটিতে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি চিনসহ মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষও আশ্রয় নিয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর মোট সংখ্যা দুই লাখের বেশি।
এদিকে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা ও অন্যান্য মিয়ানমারের নাগরিকদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরূপ মনোভাবও বেড়েছে। অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মালয়েশিয়া। এর প্রভাব শরণার্থী সম্প্রদায়ের ওপরও পড়ছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে।
প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার পাশাপাশি মালয়েশিয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য একটি নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ৮ জন, যাদের বেশির ভাগই রোহিঙ্গা, তাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব, অভিবাসন পরিস্থিতি, আশ্রয়ের দাবি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য Refugee Registration Document বা ডিপিপি কর্মসূচির আওতায় নেওয়া হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। এ মাসে তিনি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়ায় সরকারি সফরের আমন্ত্রণ জানাতে চান। আনোয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে হবে এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসন এগিয়ে নেওয়া হবে।
এর আগে জুলাইয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার সর্বোচ্চ ৫ হাজার নাগরিককে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। এরপরই মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৬০টির বেশি নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন মালয়েশিয়াকে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে ফিরে গেলে এসব মানুষ চলমান সহিংসতা, আটক, নিপীড়ন কিংবা জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
মালয়েশিয়ায় মিয়ানমারের চিন সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের প্রতিনিধি জেমস বাউই থাং বিকও প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার দাবি, মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থী রয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে ইউএনএইচসিআরের কার্ডধারী একজনও রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
জেমসের আশঙ্কা, দেশে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে জোরপূর্বক নিয়োগ বা আটকের শিকার হতে পারেন। তার মতে, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের মধ্যে ফেরত পাঠানো কিছু মানুষের জন্য গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া সরকারের দাবি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফেরত যাওয়া ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং তাদের ঝুঁকির মাত্রাও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জনকে ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুরু হলো। পরবর্তী ধাপে আরও কয়েক হাজার নাগরিককে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা এবং কতজন মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যে এই প্রত্যাবাসন কতটা নিরাপদ ও টেকসই হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।
সূত্রঃ রয়টার্স
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au