বাংলাদেশ ব্যাংক; ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ জুলাই-
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রথমবারের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করার জন্য ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ২০২৫’ নামে একটি অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারের উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক খসড়াটি ইতোমধ্যেই পর্যালোচনা করেছে এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হতে পারে। আইনটি কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত অধ্যায় বন্ধ হয়ে যাবে এবং এর জবাবদিহি শুধু জাতীয় সংসদের কাছে সীমিত থাকবে।
নতুন আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান হবে সংবিধানে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাতারে। গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের ছয় বছরের জন্য সংসদের অনুমোদন ও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ দেওয়া হবে। অপসারণের ক্ষেত্রেও কারণ দর্শানো ও আনুষ্ঠানিক শুনানির বিধান থাকবে। দায়িত্ব গ্রহণের আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সামনে শপথ নেওয়া হবে, যা এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়াবে। গভর্নরকে দেওয়া হচ্ছে মন্ত্রীর সমমর্যাদা, যা তাকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নীতিনির্ধারণে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করবে।
নতুন আইনে বাংলাদেশ ব্যাংক হবে ব্যাংক খাতের একক নিয়ন্ত্রক ও তদারকি কর্তৃপক্ষ। সব ধরনের বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মুদ্রানীতির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকবে। মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী বোর্ড হবে একেবারেই পেশাদার ও আমলাবিহীন, যেখানে থাকবে গভর্নর, দুই ডেপুটি গভর্নর ও পাঁচজন স্বাধীন সদস্য, যাদের প্রত্যেকের থাকবে অন্তত ১৫ বছরের প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা।
দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ে দ্বৈত শাসনের অভিযোগ ছিল—একদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব, অন্যদিকে আইনগত সীমাবদ্ধতা। এই কারণে ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছিল, খেলাপি ঋণ বেড়েছিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা নাজুক হয়েছিল। এই সংস্কারের মাধ্যমে সেই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হচ্ছে। আইএমএফের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার কিস্তিও এই সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।
প্রস্তাবিত আইনে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য থাকবে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ’। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই ১৫টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করেছে, যাদের মধ্যে ১৪টির পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা হয়েছে এবং একটি ব্যাংকে প্রশাসক বসানো হয়েছে। খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে গঠিত হচ্ছে অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স, যার নেতৃত্বে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক, সাথে থাকবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিএফআইইউ। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থও ফেরত আনার চেষ্টা করবে এই টাস্কফোর্স।
বাংলাদেশ ব্যাংককে ঘিরে এখন পাঁচটি বড় আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কাজ চলছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকরাপ্সি আইন, মানি লোন কোর্ট আইন, ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ এবং ডিপোজিট প্রটেকশন অধ্যাদেশ। এসবের মূল লক্ষ্য ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের অর্থের সুরক্ষা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও এতে যুক্ত হবে। তার মতে, স্বাধীন পরিচালক ছাড়া কোনো ব্যাংক নিরাপদ নয়, তাই প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অর্ধেকই স্বাধীন পরিচালক হতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাংবিধানিক মর্যাদা ও নতুন আইন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সত্যিকারের স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার ওপর। যদি নিয়োগ ও কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে, তাহলে এটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে নীতিনির্ধারণের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা না হলে সবই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।