দুর্ঘটনা এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ঘিরে মাইলস্টোন কলেজ থেকে সচিবালয় পর্যন্ত চলেছে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, উপদেষ্টা অবরুদ্ধ, এবং শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই-
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মঙ্গলবার (২২ জুলাই) কাটিয়েছে অস্থিরতার এক দিন। উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৩৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। নিহতদের অধিকাংশই শিশু শিক্ষার্থী।
এ দুর্ঘটনা এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ঘিরে মাইলস্টোন কলেজ থেকে সচিবালয় পর্যন্ত চলেছে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, উপদেষ্টা অবরুদ্ধ, এবং শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবিতে উত্তপ্ত হয়েছে পুরো দিন, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষতিপূরণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার এবং যাদের অবহেলায় প্রাণহানি ঘটেছে, তাদের শাস্তি।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে প্রাণহানি, বন্ধ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা
সোমবার দুপুরে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের উপর বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় ৩০ জনের বেশি প্রাণহানি ঘটে। আহত হন আরও অনেকে। ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে কলেজ ও আশপাশের এলাকা। গভীর রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হঠাৎ করে পরদিনের (মঙ্গলবার) এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়, যা অনেক পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে সকালেই বহু শিক্ষার্থী কেন্দ্রে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন।
মাইলস্টোন কলেজে উপদেষ্টাদের আটকে রাখে শিক্ষার্থীরা
মঙ্গলবার সকাল থেকে মাইলস্টোন কলেজ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভে নামে কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাবেক শিক্ষার্থীরা। এই সময় কলেজ পরিদর্শনে যান অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর. আবরার ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। কিন্তু সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তাদেরকে কলেজ ভবনে আটকে ফেলেন এবং “ভুয়া উপদেষ্টা” বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
উপদেষ্টারা জানালা দিয়ে হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে চাইলে তাতে কাজ হয়নি। প্রায় ৯ ঘণ্টা তারা ভবনে অবরুদ্ধ থাকেন।
শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ছয়টি দাবি উত্থাপন করেন:
১. নিহতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ
২. প্রত্যেকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান
৩. বিমান বাহিনীর নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা
৪. দায়ীদের বিচার
৫. পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা যেন সময়মতো জানানো হয়
৬. শিক্ষা সচিব ও উপদেষ্টাদের পদত্যাগ
উপদেষ্টাদের ফেরার চেষ্টা, আবার বাধা
দুপুরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে উপদেষ্টারা বের হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু দিয়াবাড়ি মোড় পেরোতেই শিক্ষার্থীরা আবার তাদের পথ রোধ করে। বাধ্য হয়ে তারা আবার কলেজ ভবনে ফিরে যান। সন্ধ্যায় পুলিশি পাহারায় উপদেষ্টারা কলেজ ত্যাগ করতে সক্ষম হন।
সচিবালয়ের সামনে রণক্ষেত্র: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ
এ সময় সচিবালয়ের সামনে সমবেত হন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভে নামে। প্রথমে মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিলেও একপর্যায়ে তারা সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিপেটার আশ্রয় নেয়। এতে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরাও ইট-পাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হন। অনেককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সচিবালয়ের আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা পরে শিক্ষাভবন, গুলিস্তান, জিরো পয়েন্টসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়।
পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা ঘিরে বিভ্রান্তি
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাত ৩টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসে, যা সরকারি ওয়েবসাইটে ও গণমাধ্যমে অনেক পরে জানানো হয়। এতে সকালে বহু শিক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়েও ফিরে আসতে বাধ্য হন। ঘটনার সময় পরীক্ষা বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগাযোগের সমন্বয়হীনতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়।
শিক্ষাসচিব প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটির ঘোষণা
বিকেলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ফেসবুক পেইজে জানান, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির মুখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব সিদ্দিক জুবায়েরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি মাইলস্টোন দুর্ঘটনার তদন্তে দ্রুত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন তিনি।