ইরান ছাড়তে জীবন বাজি রেখেছিলেন দুই ফুটবলার
ইরানের জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানানো যে তাঁদের জন্য কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা জানতেন ফুটবলার আতেফেহ রামেজানিসাদেহ ও ফাতেমেহ পাসানদিদেহ। কারাবাস, পরিবারের…
টানা আড়াই দশক ধরে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নানা কারণে এখন কিছুটা চাপে। এই পরিস্থিতিতে দলটি আবারও কট্টর হিন্দুত্বের রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। উত্তর প্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
অযোধ্যার পর উত্তর প্রদেশের কাশী, মথুরা, সম্ভল, মধ্যপ্রদেশের ভোজশালাসহ বিভিন্ন স্থানে মসজিদের ভেতর বা প্রাঙ্গণে মন্দিরের নিদর্শন খোঁজার দাবি উঠেছে। এসব নিয়ে কোথাও মামলা হয়েছে, কোথাও আইনি লড়াই চলছে। তবে সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে দেড় শতাধিক বছরের পুরোনো একটি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাহারানপুর জেলা শাসকের কার্যালয়ের পাশের ওই মসজিদটি সরকারি জমিতে নির্মিত হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল। সরকারি জমি দখলের অভিযোগে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানাও করা হয়। নিম্ন আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন মসজিদটি ভেঙে দেয়।
স্থানীয় কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের এক নেতা ২০২৫ সালে মসজিদটি সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা করেন। গত ১৬ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেট মসজিদটির নির্মাণকে বেআইনি ঘোষণা করেন এবং সরকারি জমি দখলের জন্য জরিমানার নির্দেশ দেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে মসজিদ কর্তৃপক্ষ জেলা জজ আদালতে আপিল করলেও তা খারিজ হয়ে যায়। গত ২ সেপ্টেম্বর সেই সিদ্ধান্তের পরপরই প্রশাসন মসজিদটি ভাঙার প্রস্তুতি নেয়। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই শুক্রবার রাতে এলাকায় বুলডোজার নিয়ে আসে প্রশাসন। শনিবার ভোর থেকে শুরু হয় মসজিদটি ভাঙার কাজ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ঠেকাতে সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হোসেনও তৎপর হয়েছিলেন। তবে তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
সাহারানপুরের ঘটনা নিয়ে মূল বিতর্কের জায়গা হলো সময় ও প্রক্রিয়া। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চলেছে। কাশী, মথুরা, সম্ভল কিংবা ভোজশালার মতো জায়গায়ও মসজিদ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলছে। কিন্তু সাহারানপুরে জেলা জজের রায় ঘোষণার পর উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত মসজিদটি ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় হায়দরাবাদের এআইএমআইএম নেতা ও সংসদ সদস্য আসাউদ্দিন ওয়েইসি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, এর উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
আগামী বছরের গোড়ার দিকে উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। রাজ্যে টানা তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন বিজেপির নেতা যোগী আদিত্যনাথ। কিন্তু তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে নানা বিষয়ে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে।
ব্রাহ্মণ সমাজের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ, অযোধ্যায় রাম মন্দিরের কোষাগারে চুরির ঘটনা, নিটসহ বিভিন্ন পরীক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে আন্দোলন, সব মিলিয়ে রাজ্য সরকারকে নানা চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এর মধ্যে ছাত্র-তরুণদের মধ্যেও নতুন ধরনের রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয়ও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাহারানপুরের মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে সামনে রেখে প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্য বিজেপি কি রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে ফের উগ্র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে সামনে আনছে?
শুধু সাহারানপুর নয়, বিভিন্ন রাজ্যে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি ও সংগঠনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডও এই প্রশ্নকে জোরালো করছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে একটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এক নাবালিকা ছাত্রীর বাবাকে হত্যার চেষ্টা এবং মারধরের একটি ঘটনা সম্প্রতি আলোচনায় আসে। স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামের এক যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই হামলার দায় স্বীকার করে প্রকাশ্যে বড়াই করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তিনি বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, লোক জনশক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসোয়ান এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে উল্লেখ করে নিজেকে নিরাপদ দাবি করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পরও শুরুতে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি, এমনকি এফআইআরও করা হয়নি। পরে সিজেপি, কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দলের নেতারা দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানা ঘেরাও করেন। পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত ওই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও প্রশাসন দ্বিধায় থাকে।
সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ জানিয়েছে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটি অর্থহীন। সংগঠনটির নেতারা কলকাতার এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ধর্ম যার, উৎসবও তার। তাঁদের বক্তব্য, এই নীতি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
এর পাশাপাশি দুর্গাপূজার মণ্ডপে আমিষ খাবারের স্টল না রাখার দাবিও উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই বক্তব্য নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
মহারাষ্ট্রেও নবরাত্রির গরবা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠানে মুসলমানদের প্রবেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। সংগঠনটির নেতাদের দাবি, এসব অনুষ্ঠান হিন্দুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন, সেখানে অহিন্দুদের উপস্থিতিতে পবিত্রতা নষ্ট হয়। এমনকি যাঁদের কপালে তিলক থাকবে না, তাঁদের প্রবেশ ঠেকানোর কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে নিরাপত্তারক্ষীরা আধার কার্ড দেখতে পারেন বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
রামনবমী ও রামলীলার অনুষ্ঠান নিয়েও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় দুর্গাপূজার সময় নয় দিন ধরে রামায়ণের বিভিন্ন পর্বের নাট্যরূপ পরিবেশনের পর দশেরার দিনে রাবণবধের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন ধর্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অংশ নিয়ে থাকেন।
তবে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর কিছু এলাকায় মুসলমান অভিনেতাদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তির ঘটনা ঘটেছে। অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি জানিয়েছিলেন, ২০১৬ সালে উত্তর প্রদেশের তাঁর নিজ এলাকায় রামলীলায় তাঁকে মারীচের চরিত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়নি।
২০২২ সালের পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এবার বিভিন্ন রাজ্যে রামলীলায় অহিন্দু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অংশগ্রহণ বন্ধ এবং অহিন্দুদের অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ ঠেকানোর বিষয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন করে নির্দেশনা আসার কথা বলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় বিজেপি এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে বড় কোনো আপত্তি জানায়নি। ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বিরোধীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জনঅসন্তোষ মোকাবিলায় বিজেপি কি আবারও কট্টর হিন্দুত্বের রাজনীতিকে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে?
সাহারানপুরের মসজিদ ভাঙা থেকে শুরু করে ধর্মীয় উৎসবে অহিন্দুদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি, রামলীলায় মুসলমান শিল্পীদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা কিংবা কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর একের পর এক বক্তব্য, সব মিলিয়ে ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রবণতা ফের জোরালো হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au