সীমান্তে গোলাগুলির ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে; ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই-যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার নেতারা সীমান্তে চলমান সংঘাত থামাতে জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন। সীমান্তে টানা তিনদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার স্কটল্যান্ড সফরকালীন একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প জানান, তিনি কাম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত এবং থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম উইচায়াচাই-এর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি দুই নেতাকে সতর্ক করেছেন, যদি যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করবে না।
ফুমথাম ফেসবুকে এক পোস্টে বলেন, থাইল্যান্ড যুদ্ধবিরতির নীতিগত সিদ্ধান্তে একমত, তবে কাম্বোডিয়ার ‘সত্যিকারের সদিচ্ছা’ দেখতে চায়। তিনি ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন যেন কাম্বোডিয়া সরকারকে জানান যে থাইল্যান্ড দ্রুত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে চায় এবং যুদ্ধবিরতি ও চূড়ান্ত শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় খুঁজে পেতে প্রস্তুত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, দুই দেশই ‘তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি ও শান্তি’ চায় এবং তিনি প্রত্যেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বার্তা আদানপ্রদান করেছেন।

চলমান উত্তেজনায় ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। ছবিঃ রয়টার্স
এদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি নিহত এবং ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছে।
শনিবার সকালে থাইল্যান্ডের ট্রাট প্রদেশ এবং কাম্বোডিয়ার পুরসাত প্রদেশে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা পূর্বের সংঘর্ষস্থল থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অজুহাতে হামলার অভিযোগ করেছে।
মে মাসের শেষ দিকে এক কাম্বোডিয়ান সেনা নিহত হওয়ার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়ছিল। সীমান্তে উভয় দেশের সেনা সমাবেশের পাশাপাশি পুরো কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়, যা থাইল্যান্ডের দুর্বল জোট সরকারকে বিপদের মুখে ফেলে।
থাইল্যান্ড জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তাদের ৭ সেনা ও ১৩ বেসামরিক নাগরিক এবং কাম্বোডিয়া জানিয়েছে, তাদের ৫ সেনা ও ৮ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও আসিয়ান জোটের চেয়ারম্যান আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, তিনি যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। থাইল্যান্ড সেই প্রস্তাবে নীতিগতভাবে একমত, আর কাম্বোডিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তাতে সমর্থন দিয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে থাইল্যান্ডের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে থাই ভূখণ্ডে নতুনভাবে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে তাদের সেনারা আহত হয়েছেন। এছাড়া বৃহস্পতিবার কাম্বোডিয়া আক্রমণ শুরু করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কাম্বোডিয়া অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা বিবৃতিতে জানিয়েছে, থাইল্যান্ড একটি “উসকানিমূলক ও অবৈধ সামরিক হামলা” চালিয়েছে এবং তাদের ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে।

সংঘাতের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ছবিঃ এএফপি
কাম্বোডিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা থাইল্যান্ডের এই আগ্রাসনকে তীব্রভাবে নিন্দা জানায় এবং এর সামরিক তৎপরতা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়। অন্যদিকে থাইল্যান্ড বলেছে, তারা এই বিরোধ কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে চায়।
দুই দেশের মধ্যে ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্তের নানা নির্ধারিত না হওয়া অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ১১শ শতকের প্রাচীন হিন্দু মন্দির প্রেহ ভিহেয়ার ও তা মোয়ান থম মন্দির। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত প্রেহ ভিহেয়ার মন্দিরটি কাম্বোডিয়ার বলে রায় দিলেও ২০০৮ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। এরপর থেকে কয়েক দফা সীমান্তে সংঘর্ষ হয়েছে এবং প্রাণহানিও ঘটেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশ ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন অংশ নিয়ে বিরোধে লিপ্ত। ছবিঃ রয়টার্স
সম্প্রতি কাম্বোডিয়া আবারও এই বিরোধ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে তোলার কথা বলেছে। তবে থাইল্যান্ড বলছে, তারা আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করে না এবং বিষয়টি কেবল পারস্পরিক আলোচনা দিয়েই সমাধান করতে চায়।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধবিরতি সফল হলে তিনি উভয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করবেন। তিনি বলেন, “শান্তি আসার পর আমরা আবার বাণিজ্য আলোচনা শুরু করব।”
তবে কখন এবং কোথায় এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো হোয়াইট হাউস কিংবা দুই দেশের দূতাবাস বিস্তারিত জানায়নি।
সুত্রঃ রয়টার্স