এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি। ছবিঃ এপি
মেলবোর্ন, ২২ আগষ্ট- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতকে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তার অভিযোগ, ভারত এসব তেল কিনে ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ জোগাচ্ছে। এতে ভারত এখন শুল্কের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি চাপের দেশগুলোর তালিকায় চলে গেছে।
রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। প্রতিরক্ষা খাতেও রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা অনেক পুরোনো। তবে এবার ট্রাম্পের ক্ষোভ মূলত তেলের আমদানিকে ঘিরে। ৩০ জুলাই তিনি নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ভারত ও চীন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা, যখন বিশ্ব চায় রাশিয়া ইউক্রেনে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করুক।
১৯ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, রাশিয়া থেকে ভারতের এই তেল আমদানির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে দেশের কয়েকটি ধনী পরিবার। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (RIL)।
২০২১ সালে রিলায়েন্সের জামনগর রিফাইনারির মোট তেল আমদানির মাত্র ৩ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা বেড়ে ২০২৫ সালে গড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে। এ বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাশিয়া থেকে ১ কোটি ৮৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল এনেছে জামনগর রিফাইনারি, যার মূল্য ৮.৭ বিলিয়ন ডলার। যা গত বছরের তুলনায় ৬৪ শতাংশ বেশি।
রাশিয়ার তেলের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর মূল্যসীমা আরোপের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে রিলায়েন্স। যদিও সেই মূল্যসীমা কার্যকরভাবে মানা হয়নি। শত শত জাহাজের “শেডো ফ্লিট” ব্যবহার করে রাশিয়া তেল রপ্তানি করছে বেশি দামে। এভাবেই ভারতীয় ক্রেতারা নিয়মিত রাশিয়ার তেল কিনছে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জামনগর রিফাইনারি প্রায় ৮৫.৯ বিলিয়ন ডলারের পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য গিয়েছে সেইসব দেশে, যারা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নেই গেছে ১৯.৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এর মধ্যে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তৈরি হয়েছে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন জামনগর রিফাইনারির অন্যতম বড় ক্রেতা। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশটি ৮.৪ মিলিয়ন টন তেলজাত পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে আছে ব্লেন্ডিং কম্পোনেন্ট, পেট্রোল ও ফুয়েল অয়েল। শুধু এ বছরই যুক্তরাষ্ট্র আমদানি করেছে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা গত বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি।
রিলায়েন্সের পরেই বড় আমদানিকারক হলো নায়ারা এনার্জি, যার মালিকানার বড় অংশ রাশিয়ার কোম্পানি রসনেফটের হাতে। তাদের ভাদিনার রিফাইনারি এ বছর মোট তেলের ৬৬ শতাংশই এনেছে রাশিয়া থেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল রিলায়েন্স নয়, ভারত সরকারও এই সস্তা তেল থেকে লাভবান হয়েছে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি কমেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তবে ট্রাম্পের নতুন শুল্ককে অনেকে “ভণ্ডামি” বলে অভিহিত করেছেন, কারণ রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীনকে তিনি কিছু বলেননি।
আগামী বছর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার তেল থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে রিলায়েন্সের ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে। যদিও রিলায়েন্স ইতিমধ্যে রসনেফটের সঙ্গে ১০ বছরের একটি নতুন চুক্তি করেছে, যা ভবিষ্যতে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সুত্রঃ আল জাজিরা