ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর- গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। বিক্ষোভকারীরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার ইসরায়েলের নিরন্তর হামলার নিন্দা জানালেও এখনই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।
মিলানে উত্তেজনা, পুলিশের টিয়ার গ্যাস
মিলানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। টিয়ার গ্যাস ছোড়ে পুলিশ, পাল্টা বিক্ষোভকারীরা প্রজেকটাইল নিক্ষেপ ও কাচ ভাঙচুর করেন। আয়োজকদের দাবি, শুধু মিলানেই প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান অনেকে।
দেশজুড়ে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও অবরোধ
বিক্ষোভকারীরা সোমবারকে “গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে কর্মদিবস” ঘোষণা করে সড়ক অবরোধ, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। রোমে মূল টার্মিনি রেলস্টেশনের সামনে প্রায় ২০ হাজার মানুষ জড়ো হন। তাদের অনেকেই শিক্ষার্থী। তারা “ফ্রি প্যালেস্টাইন” স্লোগান দিতে দিতে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়ান।
রোমে কেউ কেউ কলিজিয়ামের সামনে দিয়ে মিছিল করে টার্মিনি স্টেশনে পৌঁছান। মিছিলের সামনের সারিতে থাকা বিক্ষোভকারীরা বিশাল ব্যানারে লিখে রাখেন: “গণহত্যার বিরুদ্ধে। সবকিছু বন্ধ করি।”
১৭ বছর বয়সী মিকেলাঞ্জেলো ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “আমি এখানে এসেছি এমন এক জনগোষ্ঠীকে সমর্থন করতে যাদের নির্মূল করা হচ্ছে।” ১৮ বছরের ফ্রান্সেসকা টেচ্চিয়া জানান, এটাই তার জীবনের প্রথম বিক্ষোভে অংশগ্রহণ, কারণ “গাজায় যা ঘটছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়।” ৫২ বছরের শ্রমিক ফেদেরিকা ক্যাসিনো বলেন, “আজ ইতালিকে থেমে যেতে হবে। গাজার মৃত শিশু আর ধ্বংস হওয়া হাসপাতালের জন্যই আমরা প্রতিবাদ করছি। ইতালি শুধু কথা বলে, কাজ করে না।”
মেলোনি সরকারের প্রতিক্রিয়া
মিলানের সহিংসতা নিন্দা করে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, “এটি সংহতির প্রকাশ নয়, বরং সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ। এতে গাজার মানুষের জীবনে এক বিন্দুও পরিবর্তন আসবে না, বরং ইতালির সাধারণ মানুষকে ক্ষতির বোঝা বইতে হবে।”
মেলোনির ডানপন্থী সরকার ইউরোপে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলেও ইতালি তাতে যোগ দিচ্ছে না। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ইসরায়েলবিরোধী বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নেও দেশটি অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
সরকার দাবি করেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর থেকে ইতালি ইসরায়েলের কাছে কোনো অস্ত্র বিক্রি করেনি। তবে হামাসের ওই হামলায় ইসরায়েলের তথ্যমতে ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত দুই বছরে ইসরায়েলি অভিযানে ৬৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া গাজাজুড়ে দুর্ভিক্ষ, ঘরবাড়ি ধ্বংস আর বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বোলোনিয়া, তুরিনো ও অন্যান্য শহরে আন্দোলন
উত্তরাঞ্চলীয় বোলোনিয়ায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। একদল মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে তাদের সরিয়ে দেয়। তুরিনো, ফ্লোরেন্স, নেপলস ও সিসিলিতেও বিক্ষোভ হয়। জেনোয়া ও লিভোর্নোর বন্দর এলাকায় শ্রমিকরা প্রবেশপথ অবরোধ করেন।
ফিলিস্তিনের সমর্থনে ইউএসবি ট্রেড ইউনিয়ন ২৪ ঘণ্টার জাতীয় ধর্মঘটের ডাক দেয়। ফলে রোমে বাস ও মেট্রো সেবায় বিঘ্ন ঘটে এবং জাতীয় রেল যোগাযোগেও দেরি ও বাতিলের ঘটনা ঘটে।
ইতালির জনমত
ইতালির সংবাদপত্র লা স্টাম্পা-তে প্রকাশিত জরিপ প্রতিষ্ঠান ওনলি নাম্বার্স-এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ইতালির প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন গাজার মানবিক পরিস্থিতি “অত্যন্ত গুরুতর” এবং প্রায় ৪১ শতাংশ ইতালির নাগরিক চান দেশটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিক।