মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ অক্টোবর- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ও গোপন অভিযানের নির্দেশের খবরের পর ভেনেজুয়েলা ও আন্তর্জাতিক মহলে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠেছে। পার্সটুডে ও অন্যান্য প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যারিবীয় এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সিআইএকে ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর অনুমোদন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব, ইতিহাসভিত্তিক তুলনা ও এ সম্পর্কে রাজনৈতিক-সামরিক মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডসহ একটি ক্যারিয়ার গোষ্ঠী ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের ব্যাখ্যা ’নার্কো-সন্ত্রাসবাদ’ অর্থাৎ মাদকদ্রব্যের উত্পাদন, পাচার ও তৎসংক্রান্ত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনসহ কয়েকটি সূত্র বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার কোকেন উৎপাদন কেন্দ্র ও পাচার রুটে হামলার সম্ভাব্যতা বিবেচনা করছে। ইতোমধ্যে মার্কিন নৌবাহিনী ছোট নৌযানগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ করে কয়েকজনকে নিহত করার খবরও আছে, যা ঈগলপক্ষের দায় হিসাবে দেখা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে ওয়াশিংটন নিকোলাস মাদুরো সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ সীমিত করে দিয়েছে এবং মাদুরোকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত করার চেষ্টা চলছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে মাদুরো-বিরোধী পুরস্কার বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘লাতিন আমেরিকায় উসকানি’ ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রতিরোধমূলক ও প্রদর্শনীমূলক সামরিক জটলা মার্কিন প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টা। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মহলে ও সরকারি মহলে এই ধরনের পদক্ষেপকে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার মতো মনে করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতারা ইতোমধ্যে জনগণ ও সেনার ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং কোনো বিদেশি অপারেশনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবিঃ রয়টার্স
ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের প্রেক্ষিতে ইতিহাসে ১৯৬১ সালে কিউবায় সিআইএ পরিচালিত ‘বে অব পিগস’ অভিযান স্মরণ করা হচ্ছে। ওই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ছিল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আজকের পরিস্থিতি সরাসরি ‘বে অব পিগস’–এর পুনরাবৃত্তি হবে এমন নয়। মূলত তিনটি কারণে তা ভিন্ন হবে: (১) সেটি ছিল পরোক্ষ কার্যক্রম; ভেনেজুয়েলায় যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তা হবে প্রত্যক্ষ সামরিক পদক্ষেপ; (২) ভেনেজুয়েলার ভেতরেই মাদুরোর কাছে জনপ্রিয় সমর্থন ও সেনাবাহিনীর অনুগত্য এখনও দৃঢ়; (৩) আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এখন অনেক বেশি সজাগ বিশেষত লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতায় আওয়াজ তুলবে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বাধুনিক ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ (USS Gerald R. Ford) ও এর যুদ্ধজাহাজসমূহ এই অভিযানে অংশ নেবে। ছবিঃ রয়টার্স
লন্ডনভিত্তিক চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি মনে করেন, এই সামরিক মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য সরাসরি আক্রমণ নয়, বরং শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সার্কেলে ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তাকে আলাদা করা বা দুর্বল করা। তিনি বলছেন, “এটি সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হলেও সরাসরি আগ্রাসন নাও হতে পারে; শক্তি প্রদর্শনই প্রধান লক্ষ্য।”
অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা আভাস দিচ্ছেন, সিআইএর কার্যক্রম কেবল ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা-আক্রমণ না থেকে তথ্য সংগ্রহ, পরিপক্ক অপারেশন বা স্থানীয় বিরোধীদের সমর্থন/অর্থায়ন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি নেড প্রাইসও মন্তব্য করেছেন, সিআইএ অপারেশন বিভিন্ন রূপ নিতে পারে তথ্য অভিযান, অর্থায়ন বা ধ্বংসাত্মক অপারেশন এবং তাতে সরকারের উৎখাতও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও ভয় দেখার সুর পাওয়া যাচ্ছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ও ব্রাজিল সরকার সতর্ক করেছেন যে, যেকোনো বিদেশি সামরিক অপারেশন পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। লাতিন আমেরিকায় জনমত সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো ধাঁচের হস্তক্ষেপ আজকে সহজ নয়। বিশেষত যদি তা যুদ্ধে বা সরকারের উৎখাতের প্রচেষ্টায় গড়ায়।
মাদুরোকে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে আলাদা করা হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র তার গ্রেপ্তারের তথ্যদাতাকে ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল-সমৃদ্ধ দেশীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা ধনসম্পদ এবং দুর্নীতির সুযোগ অনেকেই আঞ্চলিকভাবে আয় উপার্জন করতে থাকায় পুরস্কার একা কৌশল হিসেবে কার্যকর নাও হতে পারে। অধিকন্তু, কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল করেছে, কিন্তু মাদুরো ঘনিষ্ঠ মহলে তা বিভেদ সৃষ্টি করতে পারেনি বলে তারা মনে করছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র যেসব সামরিক ও গোপন অপারেশন চালাচ্ছে তারা যদি কেবল ‘শক্তি প্রদর্শন’ পর্যায়ে থামে, তাহলে কূটনৈতিক চাপে সীমিত ফলাফল আসতে পারে: আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়া। অন্যদিকে, যদি সরাসরি আক্রমণ বা বিদেশনীতির পর্যায়ে যাওয়া হয়, তা সংগতিপূর্ণভাবে বৃহত্তর সামরিক সংঘাত, উদ্বাস্তু সঙ্কট ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। ইতিহাস ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো হস্তক্ষেপের আগে পরিণতি ভালোভাবে বিবেচনা করা দরকার, কারণ লাতিন আমেরিকায় নতুন ধরনের প্রতিরোধ বা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মার্কিন উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক মোতায়েন, সিআইএ–কে নির্দেশ এবং কূটনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অজ্ঞাত। নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দিতে পারে, তবে কীভাবে তা গড়াবে সেটা নির্ভর করছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরণ, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং ভেনেজুয়েলার ভেতরকার সামরিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন পুরো অঞ্চলে।