এই বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও এ নিয়ে নীরবতা বজায় রেখেছে। গ্রাফিক্স ছবিঃ ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন ৩ নভেম্বর: পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাটের বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকার সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, “বাংলাদেশের সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া থাকাটা ভবিষ্যতে আর প্রয়োজন হবে না।” তাঁর এই বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও এ নিয়ে নীরবতা বজায় রেখেছে।
গত ৩০ অক্টোবর কৃষ্ণগঞ্জে দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জগন্নাথ সরকার বলেন,
“আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যদি এইবার নির্বাচনে জিতি, তাহলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থাকা কাঁটাতারের বেড়া আর থাকবে না। আমরা এক ছিলাম, ভবিষ্যতেও আবার এক হবো।”
এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর পর রবিবার (২ নভেম্বর) The Indian Express–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে কাঁটাতার থাকা জরুরি। কিন্তু একবার আমরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে, বাংলাদেশ আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি দেখবে। তখন আর কাঁটাতারের দরকার হবে না।”
তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স–এ (Twitter/X) পোস্ট করে বলেন,
“বিজেপির ভণ্ডামির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বিজেপি সাংসদ ঘোষণা করছেন বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারত ও বাংলাদেশ এক হয়ে যাবে! অথচ একই বিজেপি সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অভিযুক্ত করছে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য জমি না দেওয়ার অভিযোগে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিজেপির নীরবতা প্রমাণ করছে যে এই বক্তব্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদন নিয়েই দেওয়া হয়েছে।”
প্রতিক্রিয়ায় জগন্নাথ সরকার বলেন,
“অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গ না বুঝেই সমালোচনা করছেন। একসময় আমরা এক দেশ ছিলাম, বিভাজনের পরই বাংলাদেশ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে আমরা ক্ষমতায় এলে এমন উন্নয়ন হবে যে, বাংলাদেশও আমাদের সঙ্গে থাকতে চাইবে। তখন আর সীমান্তের কাঁটাতারের প্রয়োজন হবে না।”
তিনি আরও বলেন,
“বাঙলা ছিল ‘সোনার বাংলা’। আমরা ক্ষমতায় এলে আবার সোনার বাংলা তৈরি করব। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে, এবং তখন তারাও আমাদের সঙ্গে মিলিত হতে চাইবে।”
মুসলিম ভোটারদের প্রসঙ্গে তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, তৃণমূল ও বামফ্রন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজেপিবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে।
“বিজেপি উন্নয়নে বিশ্বাস করে, বিভাজনের রাজনীতিতে নয়,” বলেন জগন্নাথ সরকার।
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এই বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। দলের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল বলেন,
“আমাদের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিষয়টি দেখছেন।”
এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে যখন পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী (Special Intensive Revision–SIR) নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই চলছে। বিজেপি দাবি করছে এই প্রক্রিয়া “বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করতে সহায়ক হবে”, অপরদিকে তৃণমূল একে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) বাস্তবায়নের আড়াল হিসেবে দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জগন্নাথ সরকারের এই বক্তব্য বিজেপির জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে তারা বাংলাদেশ থেকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, অন্যদিকে সাংসদের বক্তব্যে ‘সীমান্তহীন ঐক্যের’ ইঙ্গিত মিলেছে।
বিজেপির জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো মাতুয়া সম্প্রদায়ের সমর্থন ধরে রাখা, যারা ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে ১৮টি আসনে জেতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তৃণমূল তাদের একটি বড় অংশকে পুনরায় দলে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে।
বিজেপি ‘সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (CAA)’ এর সাফল্য প্রচার করলেও, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি এখন সীমান্ত–রাজনীতি ও উন্নয়নের বার্তার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
Source- The Indian Express