মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৯৮০ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও হাজারো মানুষ নিখোঁজ থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশজুড়ে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শুক্রবার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সর্বশেষ হতাহতের তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লা গুয়াইরা রাজ্য। সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, এই দুর্যোগে প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শুধু রাজধানী কারাকাসেই প্রায় ২০ লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আমেরিকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক লয়েস পেস বলেছেন, ভয়াবহ কম্পনের পর অনেক মানুষ এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া বহু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। একটি ভবনের সিমেন্টের স্ল্যাবের নিচে আটকে থাকা এক নারীকে দীর্ঘ সময়ের চেষ্টার পর জীবিত বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা। তবে রাজধানীর বাইরের অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দলের উপস্থিতি এখনও সীমিত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভূমিকম্পে বহু বহুতল ভবন ধসে পড়েছে, অসংখ্য সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও টেলিফোন সংযোগ ব্যাহত হওয়ায় বিদেশে থাকা ভেনেজুয়েলাবাসীরা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। বহু পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের ছবি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালাচ্ছে।
কারাকাসের বাসিন্দা তিন সন্তানের মা দায়ানা দেলগাদো অভিযোগ করে বলেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভারী উদ্ধারযন্ত্র এখনও ঘটনাস্থলে পৌঁছেনি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, তার আট বছর বয়সী ছেলে এখনও নিখোঁজ।
দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবন পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বিশেষ পুনর্বাসন তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দুটি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ক্যারিবীয় উপকূলীয় শহর মোরোনের কাছে, যা রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে। ব্রাজিলের ভূ-পদার্থবিদ মার্কোস ফেরেইরা জানিয়েছেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী এবং অগভীর ভূমিকম্প আঘাত হানায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
এদিকে ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় জানিয়েছে, বিশ্বের ২৫টি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলের প্রায় এক হাজার উদ্ধারকর্মী ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। স্পেন, জার্মানি, চিলি, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, চীন, ব্রাজিল, কাতার, পর্তুগাল, কানাডাসহ একাধিক দেশ উদ্ধারকারী দল, অনুসন্ধানী কুকুর, আধুনিক অনুসন্ধান সরঞ্জাম এবং মানবিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অসংখ্য মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে।
সুত্রঃ এএফপি