মেলবোর্ন, ১৩ নভেম্বর- রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প আবারও নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে এসেছে। একসময় ক্যাম্পের ভেতরে আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সংঘর্ষে ‘খই-মুড়ির মতো’ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটত। এখন সেই ককটেলই রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, ক্যাম্পকেন্দ্রিক অন্তত ২২ জন কারিগর সক্রিয়ভাবে হাতবোমা ও ককটেল তৈরি করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাদের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ, ফলে ককটেলের দামও দ্রুত বাড়ছে।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে এসব ককটেল কেবল ভয় দেখাতে বা আতঙ্ক ছড়াতে ব্যবহার হতো, কিন্তু এখন তাতে ছোট তারকাঁটা, কাচের টুকরা ও সাইকেলের বলের মতো প্রাণঘাতী স্প্লিন্টার মেশানো হচ্ছে। ফলে বিস্ফোরণের প্রভাব মারাত্মক হচ্ছে। সীমান্তপথে চোরাই পথে আসা ককটেলের কাঁচামাল শহরের কারিগরদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে বলেও আশঙ্কা করছে পুলিশ। পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য বিক্রি হওয়া সালফার ও গানপাউডারের কিছু অংশও এই কারিগরদের হাতে যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে নজরদারি শুরু হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুজ্জামান জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ককটেল তৈরির মূল উপাদান পটাশিয়াম ক্লোরেট ও সালফার চোরাই পথে সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে রাজধানীর অন্তত ২০টি জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভবন, ধর্মীয় উপাসনালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিল টার্গেটে। অন্তত দুটি ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। সম্প্রতি বিস্ফোরক সংক্রান্ত ১৭টি মামলা হয়েছে, যেগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে— নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি পথশিশুদেরও ককটেল বিস্ফোরণে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জেনেভা ক্যাম্পের বোমা কারিগরদের মধ্যে সেলিম ওরফে চুয়া সেলিম এবং সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল প্রধান নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এই দুইজনের অধীনে নবাব ওরফে কালা নবাব, বাবু ওরফে মো. জসিম, শাহ আলম, রনি, ফারুক ও আরও অনেকে কাজ করছে। আগে একটি ককটেলের দাম ছিল এক থেকে দুই হাজার টাকা, এখন তা তিন হাজার টাকার বেশি। পুলিশ জানায়, ক্যাম্পের প্রবেশমুখে সাতটি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ককটেল ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হচ্ছে।
জেনেভা ক্যাম্পের ৪ নম্বর ও ৭ নম্বর সেক্টরে ককটেল তৈরির দুটি অস্থায়ী আস্তানা শনাক্ত করেছে পুলিশ। ৪ নম্বর সেক্টরে চুয়া সেলিমের নেতৃত্বে নবাব ও জসিম পরিচালিত কারখানায় অন্তত ১১ জন কারিগর কাজ করে। তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী আস্তানা বদলে কাজ চালায়। অন্যদিকে ৭ নম্বর সেক্টরের এ-ওয়ান মোড়ে বুনিয়া সোহেলের কারখানায় কালু, দাগী রুবেল, ফরিদ, ফয়সালসহ অন্তত দশজন কারিগর নিয়মিত ককটেল তৈরি করছে।
তদন্তে জানা গেছে, বুনিয়া সোহেলের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ রাজধানীর বাইরে ককটেল সরবরাহ ও হামলায়ও জড়িত। সম্প্রতি ধানমন্ডি, তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এই গ্রুপের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। পুলিশের মতে, দাগী রুবেল এসব ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিল এবং ঘটনার পর থেকেই সে আত্মগোপনে রয়েছে।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া ককটেলগুলোতে এখন আঘাত সৃষ্টির উপকরণ যুক্ত হচ্ছে, যা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর। পুলিশের মতে, এটি একটি ভয়ংকর প্রবণতা, যা নিয়ন্ত্রণে না আনলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে।
গত মাসে তেজগাঁওয়ের একটি গির্জায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় নীলফামারী ছাত্রলীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, তিনি হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। একই সময়ে রাজাবাজার মসজিদ গলিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও এক ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করা হয়। কিছু ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ককটেল বিস্ফোরণে ছিন্নমূল শিশুরাও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক এই বোমা নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলার পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার এই আন্ডারগ্রাউন্ড চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি।