বাংলাদেশ

সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে হামলা, মারধর

  • 6:37 am - October 27, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬২ বার
হামলার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের অবস্থান। ছবিঃ প্রথম আলো

ঢাকায় পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর বিক্ষোভ মিছিল বের করেন সিপিবির নেতা-কর্মীরা। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া একদল ব্যক্তি হামলা চালান বলে দাবি করেছে সিপিবি।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে শুরু হওয়া এই ঘটনার সময় হামলাকারীরা প্রায় এক ঘণ্টা সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় দলটির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মারধরের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করে।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশকে অবস্থান করতে দেখা যায়। সেখানে দলটির কয়েকজন নেতা-কর্মীও উপস্থিত ছিলেন।

সিপিবির নেতা-কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপক শীলের মুক্তির পর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দলটির একটি মিছিল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়। মিছিলটি পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হওয়ার পর সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করছিলেন তাঁরা। সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান।

এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিরা ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

সিপিবির নেতা-কর্মীরা জানান, মারধরের পর তাঁরা পল্টন মোড় থেকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফিরে আসেন। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে কিছু সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলাকারীরা কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। রাত ১১টার পর তাঁরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান বলে সিপিবির নেতা-কর্মীরা জানান।

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার অভিযোগ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখার পরও তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারকে নিজের দলের লোকজনকে সামলাতে হবে। একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের সামনে এসে কীভাবে হামলা চালানো হয়, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

হামলার পর সিপিবির সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেন জলি তালুকদার। তবে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল আলম।

ওসি আরিফুল আলমের ভাষ্য, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলের মুক্তির পর ১৫ থেকে ২০ জন পল্টন এলাকায় একটি মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কিছু লোক অভিযোগ তোলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে মিছিলকারীদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। তবে সিপিবির কার্যালয়ে ভাঙচুর বা কাউকে আটক করার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে, হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, সিপিবির কার্যালয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন, এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে তাঁরা অবগত নন। এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ঘটনার পর রাত সোয়া ১২টার দিকে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি অভিযোগ করেন, এর আগেও দলটির কার্যালয়ে হামলার চেষ্টা হয়েছিল। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঘোষণা দিয়ে সিপিবির কার্যালয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে সময় প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা সফল হতে পারেননি।

সেদিনের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান হামলার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, আগের ব্যর্থতার আক্রোশ থেকেই আজকের হামলার মাধ্যমে কেউ কেউ প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সিপিবির ভূমিকার কথা তুলে ধরে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে দলটির নেতা-কর্মীরা ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছিলেন। ২ আগস্ট তাঁরা ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করেন। অথচ এখন তাঁদের ফ্যাসিবাদী শক্তি বা পতিত সরকারের সহযোগী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সিপিবির ইতিহাস তুলে ধরে দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেন, এরশাদের শাসনামলেও তাঁদের কার্যালয়ে হামলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে গানপাউডার ব্যবহার করে কার্যালয়ের তিনতলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর সিপিবিকে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। এত প্রতিকূলতার পরও সিপিবিকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন।

সোমবার রাতের হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, গভীর রাতে হামলাকারীরা কার্যালয়ে আক্রমণ করতে এসেছিলেন। তবে দলের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ এলাকা থেকে এসে কার্যালয় রক্ষায় এগিয়ে আসেন। জীবন দিলেও কমিউনিস্ট পার্টির ওপর কোনো আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন আরও বলেন, যারা বিভিন্ন স্থানে মব তৈরি করে মাজার ভাঙচুর, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা চালিয়েছে, তারা একইভাবে মব তৈরি করে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষতি করতে পারবে না।

হামলার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, দীপক শীলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তাঁর মুক্তির পর একটি মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলে ‘জয় সমাজতন্ত্র’ ও ‘জয় সর্বহারা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। এসব স্লোগানের ভুল ব্যাখ্যা থেকে হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা। তবে কোনো স্লোগানই একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার অজুহাত হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এই স্লোগান ব্যবহার করে অন্যায় করেছে বলে কেউ দাবি করলেও, সে কারণে স্লোগানটি পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সিপিবির মিছিল থেকে কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে থাকলেও সেটি দলটির কার্যালয়ে হামলার বৈধ কারণ হতে পারে না।

হামলাকারীদের পরিচয় নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানান সিপিবির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, হামলাকারীরা নিজেদের একটি রাজনৈতিক দলের লোক বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের দেওয়া পরিচয় সত্য কি না, তা নিশ্চিত নয় সিপিবি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং হামলাকারীরা তাঁদের দলের সদস্য নন বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

এই ঘটনায় সিপিবির পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ তোলা হলেও, পুলিশ বলেছে, কার্যালয়ে ভাঙচুর বা কাউকে আটকের ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে, ছাত্রদলও তাদের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। ফলে হামলায় কারা জড়িত ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই শাখার আরও খবর

হুজুরদের ভয়ে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়লেন যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুর বাবা শাহজালাল রুমি

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী মেয়েশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় আলোচনায় আসা বাবা বডিবিল্ডার শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে…

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও অপসারণের দাবি জানল টিআইবি

সরকারের অনুমতি পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে বলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি…

ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক, সৌদিকে সামরিক সহায়তা দেবে মিসর

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা কমাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে…

রিয়াদ বিমানবন্দরে আবারও হামলার দাবি হুতিদের, পাল্টা অভিযানে সৌদি জোট

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে ড্রোন হামলার দাবি…

সুনামগঞ্জে পুলিশের উপস্থিতিতে কৃপেশ রায়ের বাড়িতে মব, পরে গ্রেপ্তার

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হিন্দু যুবক কৃপেশ রায়ের বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতিতে একদল লোক জড়ো হয়ে মব সৃষ্টি করেছে। এ সময় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে…

থাপ্পড় মেরে ফাটিয়েছেন কান, বিচারে যবিপ্রবির শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এক শিক্ষার্থীর কান ফাটানোর ঘটনায় অভিযুক্ত ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী তানভীরুল হককে সাময়িক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au