সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড -বিচারের নামে প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর রূপ

  • 11:04 pm - November 17, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২২৫ বার
শেখ হাসিনা; ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায় কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে সাজানো রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই ফল। মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরের কার্যকলাপ, বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, বিচারকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, পুলিশ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা; সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে একটি কঠোর রায় অপেক্ষা করছে।  এ রায় ঘোষণার আগে ঢাকায় যেভাবে নিরাপত্তা জোরদার করা হল এবং বিচ্ছিন্ন বোমা হামলার ঘটনা ঘটল, তাতে সরকারের আতঙ্কই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এনডি টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ঠিকই বলেছেন যে তাঁকে যে আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে সেটি ছিল একটি জালিয়াতিপূর্ণ, অনির্বাচিত সরকারের প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল। বিচারিক স্বাধীনতা যেখানে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায়, সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাই ক্ষীণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনজীবীদের ওপর হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর উন্মত্ত আচরণ, শত শত নেতাকর্মীর ওপর ধারাবাহিকভাবে মামলা এসবই প্রমাণ করে যে বিষয়টি বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের একটি কৌশল।

আন্তর্জাতিক মহলও এই বিচারকে যতটা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, ততটাই সন্দেহ প্রকাশ করছে এর স্বচ্ছতা নিয়ে।আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, “হাসিনা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।” তাঁর মন্তব্য এই সত্যই তুলে ধরে যে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে চাওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে। এমন একজন নেত্রী যিনি এখনো লাখো মানুষের আস্থার প্রতীক, যার দল দেশের জন্মের ইতিহাসের প্রধান শক্তি তাকে আইনের নামে প্রতিহিংসার শিকার করা নিছক বিচার নয়, গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলাকে ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা।

রায় ঘোষণার আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও স্পষ্ট করেছিলেন কী ঘটতে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা জানি রায় কী হবে। রায় টেলিভিশনে দেখানো হবে। তারা তাকে দোষী সাব্যস্ত করবে এবং সম্ভবত মৃত্যুদণ্ড দেবে।” তাঁর এই মন্তব্য প্রমাণ করে বিচারব্যবস্থা কতটা রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং রায় পূর্বপরিকল্পিত ছিল।

এই পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ‘সাজানো নাটক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে দেশ এখন চরমপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. ইউনুস। এই বিচার, এই রায় এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক আচরণ মিলিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যেন দেশকে ধীরে ধীরে একটি পূর্ব পাকিস্তানি দমনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে জনগণের কণ্ঠরোধ, বিরোধীদের দমন ও আইনের অপব্যবহারই হয়ে ওঠে রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র হাতিয়ার।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যার সক্রিয় সদস্য দুই কোটি ছাড়িয়েছে। একটি দেশের জন্মদাতা রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে গেলে সেই দমন প্রচেষ্টার স্বাভাবিক ফল হবে প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালে দমনপীড়ন সফল হয়নি; বাঙালির মেরুদণ্ড ভাঙা যায়নি; গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আকর্ষণ রুদ্ধ হয়নি। আজ আবার সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তির চেষ্টা চলছে, কিন্তু ফলাফল যে ব্যর্থ হবে, তা দেশবাসীর অভিজ্ঞতা থেকেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

আজকের বাংলাদেশ বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার সংকটে, মানবাধিকারের চূড়ান্ত বিপন্নতায়, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষয়ে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড তাই কেবল একজন নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়, এটি দেশের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা, আইনের শাসন, এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের বিরুদ্ধে একটি আঘাত।

রাষ্ট্র যদি প্রতিহিংসা দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে স্থিতিশীলতা নয়, বরং অস্থিরতাই হবে তার অনিবার্য পরিণতি। বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সড়কে দাঁড়িয়ে। জনতার ইচ্ছাই শেষ কথা যেখানে ক্ষমতার ভয়ে ন্যায়বিচারকে হত্যা করা হয়, সেখানে জনগণ শেষ পর্যন্তই সিদ্ধান্ত নেয় কোন পথ দেশকে বাঁচাবে। যেকোনো রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। কারণ দমন যতই প্রবল হোক, মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে কখনোই পরাস্ত করা যায় না।

ড. প্রদীপ রায়, সম্পাদক, ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

সাত মাসের শিশু কন্যাকে আছড়ে হত্যার মামলায় বাবা গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: রাজধানীর উত্তরার সিরাজ মার্কেট এলাকায় সাত মাস বয়সী শিশুকন্যাকে আছড়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বাবা কবির ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন…

জাবি মেডিক্যাল সেন্টারে ২১ দিনে প্রায় ২০ হাজার ওষুধের গরমিল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিক্যাল সেন্টারে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের গরমিল ধরা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ ক্রয় কমিটির…

৯ জেলায় বন্যার শঙ্কা, আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় প্লাবিত হতে পারে নিম্নাঞ্চল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত ৯ জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে…

মন্দিরে নেওয়ার কথা বলে কিশোরীকে অপহরণের পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, নারীসহ গ্রেপ্তার ৩

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই:  ভারতের কর্নাটকের দেবনাহাল্লিতে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণের পর জোরপূর্বক মদ খাইয়ে এক নির্মাণাধীন ভবনে সারা রাত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা…

দিল্লিতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক, মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে উত্তেজনা

মেলবোর্ন, ২২জুলাই- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী…

জাপানে তীব্র তাপপ্রবাহ, ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়াল তাপমাত্রা, প্রথমবার ঘোষণা ‘চরম তাপদাহ দিবস’

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- জাপানে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার দেশটির মধ্যাঞ্চলের তিনটি শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট অতিক্রম করেছে।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au