লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত হামলাকারী
মেলবোর্ন, ২৬ জুন- লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে একই পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক ব্যক্তি। পরে ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন…
মেলবোর্ন, ২২ নভেম্বর- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর এলাকার হাকিমপুর সীমান্তে গত কয়েক দিন ধরেই অস্বাভাবিক এক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। ব্যাগপত্র হাতে নারী, পুরুষ ও শিশুরা রাস্তার ধারে বসে আছে। অনেকে ঘাসের ওপর, কেউ আবার গাছতলায়। মুখে আতঙ্ক আর ক্লান্তির ছাপ। বেশিরভাগই নীরব। কথা বলতে চাইছে না। তাদের চারপাশে বিএসএফ সদস্যরা টহল দিচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা একইভাবে বসে আছে, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায়। কেননা তারা ভারতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে বছরের পর বছর সেখানে বসবাস করছিলেন।
কেন এত মানুষ একসঙ্গে সীমান্তে
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার থেকে তীব্র হওয়া পরিস্থিতি শনিবা সকাল পর্যন্ত আরও তীব্র। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এসব মানুষই বাংলাদেশী নাগরিক, যারা বহু বছর ধরে নথিপত্র ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বাস করছিলেন। কেউ কলকাতা সংলগ্ন নিউটাউন, কেউ হাওড়া, কেউ আবার উত্তর চব্বিশ পরগনার অভ্যন্তরে দিনমজুরি করতেন। কেউ থাকতেন ঘরের কাজ করে, কেউ ইটভাটায়, কেউ রিকশা টানতেন।
গত ২৭ অক্টোবর থেকে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরু হয়েছে। এর পর থেকেই বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় থানাগুলো, মহল্লা আর বাজারে নানা গুজব ছড়ায় যে অবৈধ বাংলাদেশিদের ধরপাকড় শুরু হবে। সেই ভয়েই অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে সীমান্তমুখী হয়েছেন।
বিএসএফের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ জনের মতো মানুষ বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছে। তবে তাঁরা সাধারণত ছোট ছোট দলে আসে। একসঙ্গে এভাবে দেড়শর বেশি মানুষের সীমান্তে ভিড় আগে দেখা যায়নি।
বৃহস্পতিবারের উত্তেজনা এবং সংবাদমাধ্যম নিয়ে বিরক্তি
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাকিমপুর এলাকায় উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ভুল তথ্য প্রচার করেছে। কেউ বলেছে, সীমান্ত দিয়ে ‘হঠাৎ’ হাজার হাজার বাংলাদেশী পালাচ্ছে। এই ধরনের খবর মানুষকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।
এ নিয়েই বিক্ষোভও হয়। ক্ষুব্ধ কিছু মানুষ কয়েকজন সাংবাদিককে ঘিরে ধরে, ধাক্কাধাক্কি এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটে। এরপর সাংবাদিকরা দূরত্ব রেখে খবর সংগ্রহ করেন। ফলে শুক্রবার সীমান্তে জড়ো হওয়া বাংলাদেশীরা মুখ খুলতে আরও সতর্ক হয়ে ওঠেন।
এতদিন যারা পৃথকভাবে বা ছোট দলে সীমান্ত পেরিয়ে যেতেন, তারা এবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ফলে একসঙ্গে এত মানুষের উপস্থিতিতে স্থানীয়দের ভিড়ও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএসএফ টহল বাড়িয়েছে।
কী বলছেন তারা
হাকিমপুরে জড়ো হওয়া মানুষের অধিকাংশই বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বাসিন্দা। সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, খুলনা ও আশপাশের এলাকার মানুষ এখানে বেশি দেখা যায়।
মোমেনা বেগম নামের এক নারী জানান, তিনি প্রায় পনেরো বছর আগে সাতক্ষীরা থেকে ভারতে এসেছিলেন। নিউটাউন থানার ঘূর্ণি এলাকার মাঝেরপাড়ায় ঘরের কাজ করতেন। তাঁর ভাষায়, “পেটের টানে এসেছিলাম। এখন আর থাকা যাবে না। ভয় করছে। তাই ফিরে যাচ্ছি।”
শ্যামনগরের শহিদুল মল্লিক বলেন, তিনি হাওড়া জেলার ডোমজুড়ে দিনমজুরি করতেন। “এসআইআর শুরু হয়ে গেছে। আমরা বিদেশি। কোনো কাগজ নেই। তাই ফিরে যাচ্ছি।”
তাদের ব্যাগে আছে কম্বল, কাপড়, শিশুর খাবার, কিছু শুকনো খাবার আর পানির বোতল। কেউ কেউ ধুলোমাখা থলে থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশের কাছেই বৈধ ভিসা বা পারমিট নেই।
বিএসএফের প্রক্রিয়া: আঙুলের ছাপ থেকে তথ্য যাচাই
বিএসএফের ১৪৩ নম্বর ব্যাটালিয়ন সীমান্তে উপস্থিত থেকে প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাঁদের আঙুলের ছাপ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের ডেটাবেজে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে কেউ ভারতে কোনো অপরাধে জড়িত কি না। যদি কোনো অভিযোগ না থাকে, তাদের বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হবে। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরে যাবেন।
বিএসএফ বলছে, এদের ‘পুশব্যাক’ করে আনা হয়নি। কারণ সেই প্রক্রিয়া সাধারণত গভীর রাতে নির্জন সীমান্ত দিয়ে হয়। এখানে মানুষগুলো নিজেরাই এসে জমায়েত হয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে
এই পরিস্থিতির মধ্যে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো শুরু হয়। ফেসবুক, এক্স, ইউটিউবে নানা ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে। দাবি করা হয়, হাজার হাজার বাংলাদেশি পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
তবে অল্টনিউজ জানায়, ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও আসলে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার মংলা ফেরিঘাটের একটি পুরনো প্রতিবেদন। যেখানে যাত্রীদের ভিড় এবং দুরবস্থার কথা বলা হয়েছিল। সেটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও কিছু ইউটিউব চ্যানেল দাবি করে যে যেসব বাড়ি খালি দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর বাসিন্দারা সবাই ‘অবৈধ বাংলাদেশি’। এতে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক আরও বাড়ছে।
সূত্রঃ আনন্দ বাজার ও বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au