বাংলাদেশ

সময়ের খেয়া

মতামত- সরদার সেলিম রেজা

  • 7:45 pm - June 25, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭ বার
সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- ইতিহাসের পাতা উল্টালে প্রথমেই যে নামটা জ্বলজ্বল করে ওঠে, সে নাম—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। রোজ গার্ডেনে জন্ম নেওয়া একটা দল। প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সভাপতি মাওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। সাথে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—তখন যুবনেতা, সংগ্রামী, জেল খাটা এক তরুণ। সেদিন কেউ ভাবেনি, এই দলটাই একদিন একটা জাতির মুক্তির মশাল হবে।

আওয়ামী লীগ মানে শুধু একটা রাজনৈতিক দল না। আওয়ামী লীগ মানে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের রক্তে কেনা বাংলা ভাষা। ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। ৬ দফা। ৬ এর আন্দোলন। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। প্রতিটা ধাপে আওয়ামী লীগ ছিল সামনে। প্রতিটা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবার প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ পেল ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের সব কটিই। নিরঙ্কুশ বিজয়। জনগণ রায় দিল—আমরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা চাই। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেই রায় মানলো না। ক্ষমতা দিলো না।

৭ মার্চ ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দান। বঙ্গবন্ধু দাঁড়ালেন। লাখো মানুষের সামনে বললেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই একটা ভাষণ। ইউনেস্কো একে “বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ এই ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। এরপর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসে বললেন—“This is the Swadhin Bangla Betar Kendra. I, Sheikh Mujibur Rahman, hereby declare the independence of Bangladesh.”

এরপর ৯ মাস। ৩০ লাখ শহীদ। ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। ১ কোটি শরণার্থী। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার। তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, কামরুজ্জামান। প্রবাসী সরকার পরিচালনা করলো মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামী লীগের লাখো কর্মী-সমর্থক মুক্তিযোদ্ধা হয়ে অস্ত্র ধরলো। গ্রামে গ্রামে, গঞ্জে গঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মানুষকে সংগঠিত করলো।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিজয়। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ। জন্ম নিলো বাংলাদেশ। আর সেই বাংলাদেশের স্থপতি—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কী করলেন? যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। ৭০ কোটি ডলারের ক্ষতি। রাস্তা নেই, ব্রিজ নেই, কারখানা নেই। তবু তিনি ১৯৭২ সালেই সংবিধান দিলেন। চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা। ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসন পেল।

বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে জাতীয়করণ করলেন। ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করলেন। কৃষকদের খাজনা মওকুফ করলেন। ভূমিহীনদের জমি দিলেন। নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেন। তিনি বলেছিলেন, “সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।” তিনি নিজে সোনার মানুষ ছিলেন। তাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেট তাঁকে থামাতে পারেনি। তাঁর আদর্শকে থামাতে পারেনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সপরিবারে শহীদ হলেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ বেঁচে রইলো।

এরপর দীর্ঘ অন্ধকার। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১। সামরিক শাসন, ষড়যন্ত্র, ইতিহাস বিকৃতি। বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা। ৭ নভেম্বরকে “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” বানানো। ১৫ আগস্টকে সাধারণ দিন বানানো। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছতে পারেনি কেউ।

১৯৮১ সালের ১৭ মে। দিল্লি থেকে দেশে ফিরলেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর কন্যা। ৩২ নম্বরের বাড়িটা তখনও রক্তে ভেজা। তিনি আওয়ামী লীগের হাল ধরলেন। সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বললেন, “আমি মরতে ভয় পাই না। আমি বাবার রক্তের ঋণ শোধ করতে এসেছি।” এরপর আন্দোলন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলেন শেখ হাসিনা।

১৯৯৬-২০০১। প্রথম মেয়াদ। তিনি কী করলেন? ভারতের সাথে গঙ্গার পানি চুক্তি করলেন—যা ৩০ বছর ঝুলে ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি করলেন—যা রক্তপাত থামালো। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের আইন করলেন—ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করলেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেন।

২০০১-২০০৮। আবার অন্ধকার। ষড়যন্ত্র, ১/১, মাইনাস টু ফর্মুলা। শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে তাড়ানোর চেষ্টা। জেলে নেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু তিনি দমেননি। ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায়। তারপর থেকে টানা ১৬ বছর।

শেখ হাসিনার ২০০৯-২০২৪ শাসনামলকে ইতিহাস কীভাবে লিখবে?

তথ্য-উপাত্ত বলছে:

১. জিডিপি: ২০০৯ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ১০২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। ৪ গুণের বেশি বৃদ্ধি। বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২৫তম অর্থনীতিতে উন্নীত।

২৷ মাথাপিছু আয় : ২০০৯ সালে ৮১৪ ডলার। ২০২৪ সালে ২৭৮৪ ডলার। তিনগুণের বেশি।

৩৷ দারিদ্র্য: ২০০৯ সালে দারিদ্র্যের হার ৩১.৫%। ২০২৪ সালে ১৮.৭%। কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।

৪ বিদ্যুৎ : ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৪,৯৪২ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালে ২৭,০ মেগাওয়াটের বেশি। শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ।

৫. পদ্মা সেতু : নিজস্ব অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার সেতু। ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বকে দেখিয়ে দিলো—বাংলাদেশ পারে। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ এনে ঋণ বন্ধ করেছিল। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “নিজের টাকায় করবো।” করে দেখালেন।

৬ মেট্রোরেল : ঢাকার যানজটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। এমআরটি লাইন-৬ চালু।

৭.ডিজিটাল বাংলাদেশ : ২০০৯ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ৫%। ২০২৪ সালে ৭০% এর বেশি। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেন্টার।

৮.আশ্রয়ণ প্রকল্প : ভূমিহীন, গৃহীন মানুষকে জমিসহ পাকা বাড়ি। ৪ লাখের বেশি পরিবার ঘর পেয়েছে।

৯.বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা*: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। ১ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি উপকৃত।

১০.স্যাটেলাইট: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। মহাকাশে বাংলাদেশের পতাকা।

১১. সমুদ্র বিজয় : মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি। ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশের।

শেখ হাসিনা প্রমাণ করলেন—মেয়েরাও পারে। রাষ্ট্র চালাতে পারে। উন্নয়ন করতে পারে। ২০২ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ১০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় ৪২তম স্থান দিলো।

কিন্তু ইতিহাসের এই গৌরবগাথা সহ্য হলো না কারো কারো। যারা ১৯৭১ কে “ভাইয়ে ভাইয়ে গন্ডগোল” বলে, যারা ১৯৪৭ কে “স্বাধীনতা” বলে, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করে—তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।

ইতিহাস সাক্ষী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন বলেছিলেন, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এতো বড় মহান ব্যক্তিত্ব, তাঁকে মূল্যায়ন করবে ইতিহাস, আমার পক্ষে মূল্যায়ন সম্ভব না।” সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও জীবনদশায় বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে, অসম্মান করে কোনো কথা বলেননি। মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল।

অথচ আজ বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের একাংশ ইতিহাস বিকৃতিতে নেমেছে। বঙ্গবন্ধুকে ছোট করে কথা বলছে। ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার উল্লাস করছে। বিএনপির সাবেক নেতা ও সংসদ সদস্য, বর্তমানে জামাত ঘরানার মেজর অব. আখতারুজ্জামান সম্প্রতি বলেছেন, “আওয়ামী লীগের কার্যক্রম দিন বৃদ্ধি পাবে। এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ একটি বিশাল বড় রাজনৈতিক দল ছিল এবং এখনো আছে। এখনো তৃণমূলে লক্ষ-কোটি লোক আছে আওয়ামী লীগে। অতএব নির্যাতন-নিষিদ্ধ দিয়ে আওয়ামী লীগকে দমানো যাবে না। আওয়ামী লীগ সমহিমায় ফিরবে।”

একজন বিরোধী ঘরানার মানুষের এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে—জনগণের মন থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা যায় না।

কিন্তু আমরা কেমন বিচিত্র জাতি! হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ভাঙি না। কার্জন হল ভাঙি না। ওগুলো থাকবে, কারণ ব্রিটিশরা নির্মাণ করেছে। ওগুলো “ঐতিহ্য”। অথচ জাতির পিতার ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ভেঙে আমরা উল্লাস করি। পদ্মা সেতুর পিলারের নিচের মাটি কেটে নিয়ে যাই—কারণ ওটা শেখ হাসিনা নির্মাণ করেছে। নিজের গর্বের সেতুর গোড়া কেটে দিই। নিজের পায়ে কুড়াল মারি।

বাইরের দেশের দাসত্ব করি নিঃশব্দে। গোলামীর চুক্তি সই করি অন্ধকারে। সুশীল সমাজ তখন মুখে কুলুপ আঁটে। প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে। তারা টকশোতে “গণতন্ত্র” নিয়ে কবিতা পড়ে, কিন্তু জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়লে চুপ করে থাকে।

১৭ জুন ২০২৬। ঢাকার মহাখালী শিল্প এলাকা। আওয়ামী লীগের একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছিল। ষাটোর্ধ্ব এক নারী নেত্রী—মায়ের বয়সী, নানির বয়সী—তাঁকে যুবদলের নেতা ফয়সাল গেন্দু যেভাবে মব ভায়োলেন্সের মধ্যে অসম্মান করলো, সারাদেশের মানুষ লাইভে দেখেছে। মায়ের বয়সী নারীর গায়ে হাত ওঠে, গালি ওঠে, লাঞ্ছনা ওঠে। এই কি আমাদের রাজনীতি? এই কি আমাদের সভ্যতা?

সংবাদপত্রে আসে, বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে কথা বলায় এক নারীর গোপনাঙ্গে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়েছে। মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা আবার মধ্যযুগে ফিরে গেছি। সারাদেশে নৈরাজ্য, নাশকতা, বিশৃঙ্খলা বেড়ে গেছে। সরকার সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিশেহারা। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়, রাতে ঘুমাতে ভয় পায়।

এদিকে মহান জাতীয় সংসদ—যে সংসদে জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়—সেই সংসদ আজ চিড়িয়াখানায় পরিণত হয়েছে। সার্কাস বসেছে। অশালীন পোশাক, অশালীন বাক্য, ব্যক্তি আক্রমণ, গালাগালি। সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়, শিশুরা দেখে। তারা কী শিখবে? রাজনীতি মানে গালি দেওয়া?

এনসিপির সংসদ সদস্য মুজাহিদ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “একবেলা না খেয়ে হলেও প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে হবে। দেশের সব তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।” ভালো কথা। দেশপ্রেমের কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কার সাথে যুদ্ধ করতে চান? কার সাথে যুদ্ধ বাঁধাতে চান? প্রতিবেশীর সাথে? নিজের মানুষের সাথে?

অথচ একই সংসদে মুতা বিয়ে নিয়ে আলোচনা হয়। কাঁচা রাস্তা নিয়ে এমপির বক্তব্য ভাইরাল হয়। জাতীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামে এসব আলোচনা কেন? মৌলিক সমস্যা—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি—এগুলো আলোচনার টেবিলে আসে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ১০.৫% ছুঁয়েছে। চাল, ডাল, তেল, নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিদ্যুতের লোডশেডিং দৈনিক ৬-৮ ঘণ্টা। উন্নয়নের গল্প শোনানো হয়, কিন্তু রাতের বেলা ফ্যান ঘোরে না।

আর একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক SNB-এর রিপোর্ট বলছে, গত এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা বেড়েছে ৪৭%। টাকার অঙ্কে ৯২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। দেশে মানুষ খেতে পায় না, আর টাকা পাচার হয়ে সুইস ব্যাংক মোটা হচ্ছে।

জামাতের এক নেতা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার করলেন। বললেন, “আমার বাবা একাত্তরে শহীদ হয়েছে।” অথচ তাঁর জন্ম ১৯৮১ সালে। তিনি আরও বললেন, “আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা।” পরে জানা গেল, তাঁর বাবা এখনো জীবিত। তিনি সুস্থ আছেন, বাজারে যান, নামাজ পড়েন।

এই জাতি ভুলে যায়নি। যারা ১৯৭১ কে “ভাইয়ে ভাইয়ে গন্ডগোল” বলে, যারা ১৯৪৭ কে “স্বাধীনতা” বলে, যারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করে—তাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাহাস মানায় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলার নৈতিক অধিকার তাদের নেই।

তবু তারা কথা বলে। কারণ ইতিহাস বিকৃতি এখন রাজনৈতিক কৌশল। নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া—এটাই তাদের এজেন্ডা। কিন্তু তারা ভুলে যায়, রক্ত দিয়ে কেনা ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। লাখো শহীদের আত্মত্যাগকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায় না।

আজ দেশের তরুণরা বিভ্রান্ত। তারা দেখে—সংসদে সার্কাস, রাস্তায় মব, পত্রিকায় পাচারের খবর, টেলিভিশনে গালাগালি। তারা কাকে আদর্শ মানবে? কাকে নেতা মানবে? শিক্ষক অসম্মানিত, মুক্তিযোদ্ধা অপমানিত, নারী লাঞ্ছিত, শ্রমিক বঞ্চিত।

অথচ একদিন এই দেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল অন্যরকম। স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা থাকবে না, দারিদ্র্য থাকবে না, মানুষকে ভালোবাসবে। স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা—যেখানে ন্যায় থাকবে, সাম্য থাকবে, মানবিক মর্যাদা থাকবে।

আজ সেই স্বপ্ন কোথায়? আমরা কি সেই পথ থেকে সরে গেছি? নাকি কেউ ইচ্ছে করে আমাদের পথ ভুলিয়ে দিচ্ছে?

ইতিহাস মেনে নেবে না সরদার সেলিম রেজা। ইতিহাস কারো রাগ-অভিমান দেখে না। ইতিহাস শুধু কাজের হিসাব রাখে। কে দেশ গড়েছে, কে দেশ ভেঙেছে। কে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, কে মানুষের বুকে ছুরি মেরেছে।

সময়ের খেয়া ঘুরছে। আজ যারা ধ্বংসের উৎসবে মাতে, মন্দির ভাঙে, মসজিদে আগুন দেয়, ইতিহাসের স্থাপনা ভাঙে, নারীকে অপমান করে, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে—কাল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই তারাই পড়ে থাকবে। জনগণ তাদের মনে রাখবে না। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

আর যারা বাতিঘরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে—ঝড়ের মুখে, ঢেউয়ের আঘাতে, নিভে যাওয়ার ভয় নিয়েও—তাদের নাম ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবে। কারণ বাতিঘর হওয়া মানে নিজের জন্য জ্বলা না। বাতিঘর হওয়া মানে অন্যের তীরে পৌঁছানো।

তাই আসুন, আমরা আবার মানুষ হই। রাজনীতি করি, কিন্তু অমানুষ হই না। বিরোধ করি, কিন্তু শত্রুতা করি না। ইতিহাসকে সম্মান করি, কারণ ইতিহাসই আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে।

সময়ের খেয়া একদিন ঘাটে ভিড়বেই। সেদিন কে নৌকা থেকে নামবে মাথা উঁচু করে, আর কে নামবে লজ্জায় মুখ ঢেকে—সেটা সময়ই বলে দেবে।

লেখক- সরদার সেলিম রেজা। কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র ঢাকা।

এই শাখার আরও খবর

২৮ জুন থেকে আবার চালু হচ্ছে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আবারও পর্যটক ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছে ভারত। দীর্ঘ বিরতির পর আগামী ২৮ জুন (রোববার) থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা…

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প নিয়ে এ পর্যন্ত কী কী জানা গেল

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর দেশজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে…

দেশে ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেওয়ার উদ্যোগ

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে…

তিস্তাসহ নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা জোরদারে ঢাকা-বেইজিংয়ের ঐকমত্য

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- বাংলাদেশের তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং পানিসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। এ লক্ষ্যে…

নকআউটে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ কে, অপেক্ষা ‘এফ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচের

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ করে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে শেষ ৩২ দলের লড়াইয়ে কার্লো আনচেলত্তির দলের…

চীনে ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খুলছে বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ২৫ জুন- চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ ও বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au