মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনাপতি বীরউত্তম এ কে খন্দকার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ ডিসেম্বর- মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনাপতি, বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রথম প্রধান, সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান ও সাবেক মন্ত্রী এ কে খন্দকার বীরউত্তম আর নেই।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৬ বছর। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর এক বার্তায় তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এ কে খন্দকার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংগঠক। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর তিনিই ছিলেন প্রথম প্রধান। স্বাধীনতার পর তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করে।
সামরিক জীবনের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন এ কে খন্দকার। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে তিনি রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেন। পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাবনা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
তবে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের এক পর্যায়ে বিতর্কও আসে। ২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তার লেখা বই ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি অনুচ্ছেদে ভুল তথ্য থাকার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং তিনি সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। পরে ২০১৯ সালে বইটির ওই অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করে নিয়ে তিনি জাতির কাছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এ কে খন্দকারের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি রংপুরে। তার পৈত্রিক বাড়ি পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার পুরান ভারেঙ্গা গ্রামে। বাবা খন্দকার আব্দুল লতিফের চাকরির সুবাদে তার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের শুরু হয় নওগাঁ মিউনিসিপ্যাল স্কুলে। পরে ১৯৪৭ সালে মালদহ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বর্তমান বুয়েটে পড়াশোনা করতে গিয়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই সময়ের বড় একটি অংশ কেটেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা ঘাঁটিতে উইং কমান্ডার হিসেবে বদলি হয়ে আসেন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণআন্দোলনের দিনগুলো খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর পর ২৮ মার্চ তিনি দুই সপ্তাহের ছুটি নেন। পরে তিন দফা প্রচেষ্টার মাধ্যমে ১৫ মে পরিবার ও বিমান বাহিনীর কয়েকজন বাঙালি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের আগরতলায় পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
পরবর্তীতে ভারতের নাগাল্যান্ডে দুই মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ভারতের দেওয়া তিনটি বেসামরিক বিমান এবং কয়েকজন বাঙালি বৈমানিক নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা শত্রুর বিরুদ্ধে একাধিক সফল আক্রমণ পরিচালনা করেন।
স্বাধীনতার পর এ কে খন্দকার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্রগঠনে তার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।