বাংলাদেশ

কালের কণ্ঠের সঙ্গে সাক্ষাৎকার

রাষ্ট্রপতি বললেন, টানা দেড় বছর বন্দিদশায় ছিলেন

  • 3:49 pm - February 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৫ বার
গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন। ছবি : কালের কণ্ঠ

মেলবোর্ন ২৩ ফেব্রুয়ারি- রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপে প্রকাশ করেছেন তার দুই বছরের বঙ্গভবন বন্দিদশার অভিজ্ঞতা ও নানা চক্রান্তের মুখোমুখি থাকার বর্ণনা। তিনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করার এবং রাষ্ট্রপতি অপসারণের জন্য বহু ষড়যন্ত্র চলেছিল। তবে তিনি দৃঢ়চিত্তে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন এবং কোনো ষড়যন্ত্র সফল হতে পারেনি।

ছবি-সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি বলেন,

২২ অক্টোবর ২০২৪, বঙ্গভবন ঘেরাও হলো। অমুকের দল, তমুকের দল, মঞ্চ, ঐক্য—কত কী! রাতারাতি সৃষ্টি! এগুলো একই টাইপের লোকজন সব বিভিন্ন ফোরামে, বিভিন্ন নামে। কোথায় তারা এত টাকা পেল?

এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিল। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া। তারপর যখন সাউন্ড গ্রেনেড মারা হলো, লাফ দিয়ে পড়ল। পড়ার পর সে পড়েই থাকবে, ছবি তোলা হবে। সে ডাকছে ক্যামেরাম্যানকে যে ছবি তোলো, ছবি তোলো। মানে এটা দিয়ে সে ব্ল্যাকমেইল করবে। তারপর তাকে মহিলা পুলিশ দিয়ে আর মহিলা আর্মি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে তুলে আর্মির জিপে করে নিয়ে যায়।

ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? সেই অবস্থা যদি হতো, তখন একটা কথা ছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার এপিসি দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’

তারপর দেখি, হ্যাঁ, কিছু স্থানীয় লোক এসে ওদের নিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লোক আবার থেকে যায়। তাদের সরাতে রাত ২টা বেজেছে। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত আমরা তো জেগে আছি। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় তারা মিটিং করছে- রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই, রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই। রাজু ভাস্কর্যের ওখানে, তারপর বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রুপ করে তারা এটা চায়।

আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।

মূলত গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও একটা সিদ্ধান্তে এসেছিল। সেটা হলো, যদি রাজনৈতিক দলগুলো চায় আমি অপসারিত হই, তাহলেই শুধু আমি অপসারিত হতে পারি; নচেত্ নয়। পরে দেখা গেল যে এই ইস্যুতে দুটি গ্রুপ হয়ে গেল। গ্রুপে গ্রুপে মিটিং হলো, আলোচনা হলো। তারা বিভিন্ন দল ও জোটের কাছে গেল। তখন এ রকম একটা অবস্থা ছিল—যেকোনো মুহূর্তে মেজরিটি হয়ে গেলেই আমি অপসারিত হয়ে যাব বা আমার মনস্তাত্ত্বিক দিক ভেঙে যাবে। তখন তারা আমাকে অনুরোধ করবে পদত্যাগের জন্য।

কিন্তু বিএনপি থেকে উচ্চপদে আসীন নেতা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, ‘আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।

আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো।

ওটা সবচেয়ে বড় মুভ ছিল আমাকে অপসারণ করার। মানে, তারা এত বেশি চ্যালেঞ্জিং ভাবনার মধ্যে ছিল যে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। যার ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসা, কথা বলা—এসব সযত্নে তারা করেছে। এই আলাপটাকে তারা ইতিবাচক দিকে নিয়ে যেতে পারবে—সেই বিশ্বাসটা তাদের মধ্যে ছিল। যার ফলে তারা বিভিন্নভাবে প্রতিদিন টাইম দিয়ে, সময় করে বিভিন্ন দলের কাছে যাওয়া, তাদের সঙ্গে কথা বলা, বের হয়ে এসে সাংবাদিকদের ফেস করা; এই সব কাজই কিন্তু হয়ে গেছে এর মধ্যে। আমিও অত্যন্ত উদ্বিগ্নভাবে লক্ষ করছি—দেখা যাক না, কী হয়! একসময় দেখা গেল যে আপনা-আপনিই এটা নীরব হয়ে গেল; আর এগোতে পারল না। তাতে বোঝা গেল যে এটা হবে না।

হ্যাঁ, বলতে গেলে শেষ সময় পর্যন্ত তারা চেষ্টা করে গেছে—কিভাবে আমাকে উপড়ে ফেলা যায়। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে ওই উদ্যোগটা ব্যর্থ হলে খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আজকে বলতে দ্বিধা নেই যে একটা অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানোর চক্রান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই মুভটা হয়েছে।

আমি বিষয়টি জেনেছি। সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তাঁরা ঘণ্টাব্যাপী মিটিং করেন। তবে ওই বিচারপতি রাজি হননি। উনি সাফ বলে দিয়েছিলেন, ‘উনি রাষ্ট্রপতি, উনি সবার ঊর্ধ্বে সাংবিধানিকভাবে, সবকিছুর ওপরে। ওই জায়গায় আমি অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না।’ ওই বিচারপতির দৃঢ়তার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের ওই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।

তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা তার সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করেননি এবং বিদেশ সফরসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি প্রকাশ করেছেন, বিদেশ সফরে তার ছবি অপসারণ, হাইকমিশনে তার ছবি নামানো এবং প্রেস উইং কার্যত বন্ধ করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল, যা জনগণের কাছে তার উপস্থিতি ও প্রকাশ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ছিল।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মতে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তার দৃঢ় মনোবল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিএনপি ও তাদের জোটের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি জানান, দেড় বছরের এই অভিজ্ঞতা তার জীবনের অন্যতম কঠিন সময় ছিল, যা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে জড়িত।

এই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি তাঁর ব্যক্তিগত দুঃসাহসিকতা, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেশের সংবিধান ও সংবিধানিক স্থিতিশীলতার প্রতি তার অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

এই শাখার আরও খবর

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, হামলা স্থগিতের ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর…

আংশিক খুলছে কাতারের আকাশপথ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংকারে লাখো ইসরায়েলি

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতার সীমিত পরিসরে তাদের আকাশপথ আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।…

সমাধানের পথ নেই, বাংলাদেশের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি

মেলবোর্ন, ০৭ মার্চ- ইরানের সাথে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের রেশ সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে পড়েছে বাংলাদেশ তার…

ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে গোপন সম্পদ? প্রশ্নের মুখে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

মেলবোর্ন ৭ মার্চ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতি,…

ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে সশস্ত্র রোবট, প্রযুক্তিনির্ভর লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়

মেলবোর্ন, ৭ মার্চ- রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আকাশজুড়ে গুপ্তচর ও হামলাকারী ড্রোনের ঝাঁক নিয়মিত উড়তে…

ইরানে এযাবৎকালের ‘বৃহত্তম বোমাবর্ষণ’ হতে পারে আজ রাতেই

মেলবোর্ন,৭ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au