বাংলাদেশ

প্রয়োজনমতো তেল পাচ্ছেন না কৃষক, সেচ ও ধান কাটা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

  • 2:26 pm - April 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৪৭ বার
সেচ ও ধান কাটা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৪ এপ্রিল- দেশজুড়ে বোরো মৌসুমে সেচ ও কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। ডিজেলের ঘাটতি ও বাড়তি দামের কারণে সেচ দেওয়া, জমি প্রস্তুত করা এবং ফসল কাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। এতে সামনে খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের কৃষক মো. আজগর চলতি মৌসুমে প্রায় তিন একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। গত এক সপ্তাহে একাধিকবার বাজারে গিয়েও তিনি প্রয়োজনমতো ডিজেল পাননি। একবার ১০ লিটার চাইলেও তাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪ লিটার, তাও আবার প্রতি লিটারে প্রায় ২০ টাকা বেশি দামে। তিনি জানান, বেশিরভাগ সময় ডিজেলের দোকান বন্ধ থাকে, আর খোলা থাকলেও চাহিদামতো জ্বালানি পাওয়া যায় না।

একই চিত্র পাশের সরফভাটা ইউনিয়নের কৃষক মো. আলমগীরের ক্ষেত্রেও। তিনি বলেন, ধানের শিষ বের হওয়ার সময় এখন সবচেয়ে বেশি সেচ প্রয়োজন। এই সময় পানি দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু প্রতিদিন বাজারে গিয়েও তিনি পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জামালপুর, পটুয়াখালী, রাজশাহী, গাজীপুর, বরগুনা, সিলেট, ফরিদপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারীসহ অন্তত ১২ জেলার কৃষকেরা জানিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে জ্বালানি।

দেশের কৃষিখাতে ব্যবহৃত সেচযন্ত্রের বড় একটি অংশ ডিজেলচালিত। গভীর ও অগভীর নলকূপ, লো-লিফট পাম্প, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, থ্রেশারসহ অধিকাংশ কৃষিযন্ত্রই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এসব যন্ত্রের জন্য নিয়মিত জ্বালানি না পেলে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্রের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ ৩১ হাজার। এর মধ্যে কম্বাইন্ড হারভেস্টর রয়েছে ১০ হাজার ৭২৬টি, আর মাড়াই-ঝাড়াইসহ অন্যান্য যন্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৯৬ হাজার। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত সেচ মৌসুমে এসব যন্ত্র চালাতে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের হিসাব বলছে, শুধু সেচযন্ত্রেই ছয় মাসে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি প্রয়োজন। এই বিশাল চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় কৃষি খাতে চাপ বাড়ছে।

কৃষকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করেন, যাদের অনেকেরই লাইসেন্স নেই। সাম্প্রতিক সময়ে মজুতদারি রোধে অভিযানে তেল জব্দ হওয়ায় এবং জরিমানার ভয়ে অনেক বিক্রেতা তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে সরবরাহে ঘাটতি আরও বেড়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন। দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টনের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টন। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নিতে ভিড় বাড়ছে, সরবরাহ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক সময় স্টেশনগুলো দিনের বড় অংশ বন্ধ থাকছে।

এদিকে বরগুনার কেউরবুনিয়া ইউনিয়নের কৃষক মো. মামুন জানান, তার পাওয়ার টিলার নিয়মিত চালাতে পারছেন না। মাঝে মধ্যে ডিজেল পেলেও প্রতি লিটার ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে, যেখানে নির্ধারিত দাম ১০০ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে ধান কাটার মৌসুম শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বর্তমানে দেশে ধান কাটার কাজে কম্বাইন্ড হারভেস্টরের ব্যবহার বাড়ছে, যা সম্পূর্ণ ডিজেলনির্ভর। একটি হারভেস্টার চালাতে দৈনিক ৬০ থেকে ৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এই জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি হলে সময়মতো ফসল ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে দ্রুত ধান কাটার প্রয়োজন হয়, কারণ আগাম বন্যা এলে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি যন্ত্রপাতি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কৃষি যন্ত্রের মালিকদের তালিকা অনুযায়ী পরিচয়পত্রভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হলে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে মজুতদারি রোধ হবে এবং প্রকৃত কৃষকেরা জ্বালানি পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে। তাই কৃষি খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি এবং ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা করারও পরামর্শ দেন তিনি।

দেশে উৎপাদিত মোট চালের প্রায় ৫২ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। ফলে এই মৌসুমে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হলে তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এমন অবস্থায় কৃষকদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রঃ প্রথম আলো

এই শাখার আরও খবর

নতুন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে কমেছে জাহাজ চলাচল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই:  যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও…

সাত মাসের শিশু কন্যাকে আছড়ে হত্যার মামলায় বাবা গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: রাজধানীর উত্তরার সিরাজ মার্কেট এলাকায় সাত মাস বয়সী শিশুকন্যাকে আছড়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বাবা কবির ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন…

জাবি মেডিক্যাল সেন্টারে ২১ দিনে প্রায় ২০ হাজার ওষুধের গরমিল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিক্যাল সেন্টারে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের গরমিল ধরা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ ক্রয় কমিটির…

৯ জেলায় বন্যার শঙ্কা, আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় প্লাবিত হতে পারে নিম্নাঞ্চল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত ৯ জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে…

মন্দিরে নেওয়ার কথা বলে কিশোরীকে অপহরণের পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, নারীসহ গ্রেপ্তার ৩

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই:  ভারতের কর্নাটকের দেবনাহাল্লিতে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণের পর জোরপূর্বক মদ খাইয়ে এক নির্মাণাধীন ভবনে সারা রাত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা…

দিল্লিতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক, মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ

মেলবোর্ন, ২২জুলাই- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au