বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- যুক্তরাজ্যের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলে মেয়র পদে লড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মনোনয়ন নিয়ে তিনি এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নিউহামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী লেবার পার্টির হয়ে মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ায় বিষয়টি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আগামী ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে ফরহাদ হোসেনকে কনজারভেটিভ পার্টি, গ্রীন পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট সাতজন প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। নিউহাম বরো বহু সংস্কৃতির একটি জনপদ হিসেবে পরিচিত, যেখানে বিশ্বের দুই শতাধিক ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
ঐতিহাসিকভাবে নিউহাম লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৫ সালে বরোটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কখনোই এই কাউন্সিল লেবার পার্টির হাতছাড়া হয়নি। ফলে দলটির মনোনয়ন পাওয়া ফরহাদ হোসেনের জন্য রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারে জন্ম নেওয়া ফরহাদ হোসেনের পারিবারিক শিকড় সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজোড় ইউনিয়নে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন ও মা নাজমা বেগম ১৯৬৫ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। লন্ডনে জন্ম নেওয়া ফরহাদ নিউহামেই বড় হয়েছেন। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে তিনি নিউহাম সিক্সথ ফর্ম কলেজ থেকে এ–লেভেল সম্পন্ন করেন এবং পরে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন থেকে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতা করেছেন, লন্ডন অলিম্পিক আয়োজনের বিড টিমে কাজ করেছেন এবং সাত বছর যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প লওয়ার থেমস ক্রসিংয়ে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি কমিউনিটি উন্নয়ন এবং ক্রিকেট সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন।
২০০৬ সালে স্থানীয় একটি পরিকল্পনা সংক্রান্ত ইস্যুতে এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তিনি লেবার পার্টিতে যোগ দেন এবং ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দায়িত্ব পালনকালে তিনি কাউন্সিলের ক্যাবিনেটে কমিউনিটি নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয়ে ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন। পরিচ্ছন্নতা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, যত্রতত্র ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রতিটি এলাকায় আইন প্রয়োগকারী দল সক্রিয় রাখা এবং গাড়ির মালিকদের প্রথম পার্কিং পারমিট বিনামূল্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এছাড়া বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ব্যালট চালুর কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনে জয়ী হলে নিউহামকে আরও অংশগ্রহণমূলক, সেবামুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি আধুনিক নগর প্রশাসন হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
নিউহাম বরোতে বর্তমানে তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে এবং সবকটিতেই লেবার পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। লন্ডনের ৩২টি বরোর মধ্যে মাত্র চারটিতে নির্বাহী মেয়র পদ্ধতি চালু আছে, যার একটি নিউহাম।
পূর্ব লন্ডনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বরো টাওয়ার হ্যামলেটসেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। সেখানে বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান আবারও প্রার্থী হয়েছেন, পাশাপাশি লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের শক্ত উপস্থিতি প্রবাসী কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবেরই প্রতিফলন।